‘আমার সন্তানের লাশটা আমারে বুঝায়ে দেন ভাই’

‘আমার সন্তানের লাশটা আমারে বুঝায়ে দেন ভাই’

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী একটি বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় স্বজনদের আহাজারি আর ক্ষোভে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। নিখোঁজদের সন্ধানে দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরুর দাবিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ঘাটজুড়ে। ভুক্তভোগীরা তাদের স্বজনদের লাশ বুঝিয়ে দেওয়ারও দাবি করছেন।

বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন এলাকায় কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি নদীতে পড়ে যায়।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসটিতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল।

ঘটনার পরপরই স্থানীয়ভাবে ১০ থেকে ১২ জনকে উদ্ধার করা হলেও বাকিদের অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বাসটি প্রায় ৬০ ফুট গভীরে ডুবে গেছে, ফলে ভেতরে থাকা যাত্রীদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।

ঘটনাস্থলে ছুটে আসা স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।অনেকেই অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় পার হলেও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হয়েছে। নিখোঁজদের স্বজনদের কেউ বিলাপ করে কাঁদছেন। কেউ নদীর তীরে স্বজনের লাশটি নিজ চোখে দেখার অপেক্ষা করছেন। 

ভুক্তভোগীদের একজন জানান, তার পরিবারের পাঁচজন ওই বাসটিতে ছিলেন।

তার স্ত্রী, দুই বছরের মেয়ে ও তার বোন নদী থেকে তীরে উঠতে পেরেছেন। কিন্তু তার সাত বছর বয়সী ছেলে ও ১১ বছরের ভাগনে এখনও বাসের ভেতর রয়ে গেছে। দুই-তিন ঘণ্টা আগে ঘটনাটি ঘটলেও সংশ্লিষ্টরা কোনো কাজই করছেন না বলে তার অভিযোগ। কান্নারত অবস্থায় তিনি বার বার বলছেন, ‘আমার সন্তানতো আর নাই। ওর লাশটা আমারে কেউ বুঝায়া দেন।আমার ভাইগনার লাশটা দেন। আমাগো কোনো টাকার দরকার নাই। আমাগো লাশগুলা দিয়া দেন।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বাসটি যে অবস্থায় নদীতে পড়েছে তাতে করে ধারণা করা যায়, যে কয়েকজন তীরে উঠতে পেরেছেন তারা বাদে বাকি সবাই মারা গেছেন।

এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভুক্তভোগী স্বজনরা নিজ নিজ আত্মীয়ের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জানাচ্ছেন। আউয়াল আনোয়ার নামে একজন কলেজ শিক্ষক তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমার ছোট বোন আর নেই। লাশ গোয়ালন্দ হাসপাতালে। ভাগনে ও নাতি বাসের ভেতর নদীতে।’

এদিকে ঘটনাস্থলে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ক্যাবিনেট মিটিংয়ে ছিলেন। ঘটনার পরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছেন বলে জানা গেছে। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরও দেখা গেছে। উত্তেজিত জনতা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে স্লোগান দিতে থাকে।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন জানান, স্থানীয় ডুবুরি দল ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং ঢাকা সদর দপ্তর থেকে আরও বিশেষ ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তবে, ঝড়-বৃষ্টির কারণে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানান তিনি। 

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর সময় পন্টুনের সোজা পকেট দিয়ে বাসটি নদীতে পড়ে যায়। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং দ্রুত পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি চলছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবহাওয়া ও স্রোতের কারণে উদ্ধার কার্যক্রমে কিছুটা বিলম্ব হলেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তারা। 

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS