সকাল থেকেই রাজধানীর মিন্টো রোডের যমুনা ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সংলগ্ন এলাকায় ছিল বাড়তি সতর্কতা। আশপাশের এলাকায় মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ। কোথাও কোথাও ব্যারিকেড বসিয়ে সীমিত করা হয় যান চলাচল। সরকারের এই কড়াকড়ি নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্পষ্ট করে দেয়, নবম পে স্কেল নিয়ে চলমান আন্দোলনকে আর হালকা করে দেখছে না প্রশাসন।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে আন্দোলনকারীরা শহীদ মিনার এলাকা হয়ে যমুনার দিকে রওনা হলে এক পর্যায়ে তারা পুলিশি বাধার মুখে পড়েন। আন্দোলনকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সেখানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
আন্দোলনকারীরা নতুন বেতন কাঠামোকে ‘অপর্যাপ্ত ও বৈষম্যমূলক’ বলে রাস্তায় নামলেও সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানেই রয়েছে।এই বাস্তবতায় নবম পে স্কেল আন্দোলন এখন শুধু বেতন কাঠামোর প্রশ্ন নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
নবম পে স্কেল কী?
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ করা হয় নির্দিষ্ট পে স্কেল অনুযায়ী। সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার পর্যায়ক্রমে এই স্কেল পরিবর্তন করে থাকে।
নবম পে স্কেল হলো সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত সর্বশেষ বেতন কাঠামো।
এতে গ্রেড সংখ্যা পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে, মূল বেতন কিছুটা বাড়ানো হয়েছে এবং একাধিক ভাতা নতুনভাবে সমন্বয় বা পুনর্গঠন করা হয়েছে।
সরকারের দাবি, এই পে স্কেল বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে কর্মচারীদের বড় একটি অংশ বলছে, কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে না।
আন্দোলনের প্রেক্ষাপট: কেন মাঠে নামলেন কর্মচারীরা
নবম পে স্কেলের খসড়া কাঠামো প্রকাশের পর থেকেই অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশেষ করে নিম্ন ও মাঝারি গ্রেডের কর্মচারীরা বলছেন, বাজারদরের তুলনায় বেতন বৃদ্ধি অপ্রতুল।বাড়িভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় সামাল দেওয়া বর্তমান বেতনে কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়েছে এই অভিযোগও তাদের। এই দাবিগুলো নিয়েই আজ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীরা রাজপথে নামেন।
‘স্বস্তি নেই বেতনে’
ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ড সহকারী সালমা খাতুন আজ আন্দোলনে যোগ দিতে এসে পুলিশের ব্যারিকেডে আটকে পড়েন।
তিনি বলেন, আজ রাস্তায় পুলিশ-বিজিবি দেখে বুঝলাম সরকার আমাদের কথার চেয়ে শৃঙ্খলাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু বেতন বাড়ার কথা বললেও সংসার চালানো আগের চেয়ে কঠিন।
সালমার স্বামী অসুস্থ, দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। তিনি বলেন, বেতন কাগজে বাড়লে কী হবে, বাজারে গেলে তো সেই কাগজ কেউ নেয় না।
কর্মচারীদের দাবি
আন্দোলনকারীরা বলছেন, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। বর্তমান সরকার ২০২৫ সালের জুলাই মাসে পে কমিশন গঠন করেছিল। এই কমিশন প্রায় ছয় মাস ধরে তিন শতাধিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়।
সুপারিশে নিম্ন স্কেল, অর্থাৎ ৪র্থ শ্রেণির ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়।
তবে সরকার এই সুপারিশ আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। আন্দোলনকারীরা এটিকে কালক্ষেপণের কৌশল হিসেবে দেখছেন।
একটি বাহিনীতে কর্মরত মো. জসীম উদ্দিন বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর নতুন পে স্কেল পাওয়ার কথা থাকলেও ১১ বছরেও কোনো নতুন বেতন কাঠামো হয়নি। আমার বেসিক বেতন ৯ হাজার ৩০০ টাকা। পরিবারের সদস্য ছয়জন। এই বেতনে চলতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। বাধ্য হয়েই রাস্তায় নেমেছি।
সহকারী শিক্ষক মো. আকরাম হোসেন বলেন, আমাদের টিফিন ভাতা মাসে ২০০ টাকা আর যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা। বলেন তো, এই টাকায় আমরা কীভাবে চলি?
নির্বাচনের আগে কড়াকড়ির বার্তা?
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি এখনও পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি আলোচনার পথ খোলা রাখতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আজ পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েনের মাধ্যমে সরকার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেওয়া হবে না। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, এই কড়াকড়ি কি অসন্তোষ কমাবে, নাকি চাপ আরও বাড়াবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আইনুন ইসলাম বলেন, সরকার চাইলে এখনই গেজেট প্রকাশ করতে পারে, তাহলে পরবর্তী সরকার সেটি বাস্তবায়ন করবে। সরকার বারবার ইতিবাচক মনোভাবের কথা বলেছে, তাই তাদের উচিত কথা রাখা। কারণ এই কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের অনেকেই নির্বাচনী কাজে যুক্ত থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন নতুন বেতন কাঠামো না থাকায় কর্মচারীদের দাবি যৌক্তিক। এটি বাস্তবায়ন দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। আর মাত্র এক সপ্তাহ পর নির্বাচন—এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন ও সরকারের কঠোর অবস্থান নির্বাচনকে শঙ্কার মুখে ফেলতে পারে।
নবম পে স্কেল নিয়ে চলমান আন্দোলন সরকারের জন্য এখন শুধু বেতন কাঠামোর বিষয় নয়। এটি হয়ে উঠেছে কঠোরতা বনাম সমঝোতা, শৃঙ্খলা বনাম ন্যায্যতা এবং নির্বাচনের আগে জনঅসন্তোষ ব্যবস্থাপনার বড় এক পরীক্ষা।