ক্র্যাবের পিকনিক বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে সন্ত্রাসীরা

ক্র্যাবের পিকনিক বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে সন্ত্রাসীরা

নরসিংদীতে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় দলবদ্ধ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)-এর পিকনিক বাসে হামলার এক পর্যায়ে আগুনও ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল বাসে থাকা সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের সদস্য নারী-শিশুদেরও।

সাংবাদিকদের ভাষ্য, মাধবদীর ড্রিম হলিডে পার্কের বিপরীতে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো ওই হামলার সময় সাংবাদিকরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরিচয় শোনার পর সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরা যেন আরও হিংস্র হয়ে ওঠে।

হায়েনার মতো উন্মত্ত আচরণে তারা নির্বিচারে হামলা চালাতে থাকে। 

সোমবার দিনভর ড্রিম হলিডে পার্কে ক্র্যাবের ফ্যামিলি ডে উদযাপন শেষে সেখান থেকে বেরিয়ে সড়কের বিপরীতে ঢাকার উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের বহন করা বাসে শিশু, নারী, সাংবাদিকসহ পরিবারের লোকজন অবস্থান করছিলেন। তখন চাঁদার দাবিতে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজরা সেখানে হট্টগোল করে। অবরুদ্ধ করে বাস।এক পর্যায়ে তারা হামলা চালায়। তখন শিশু, নারীসহ পরিবারের লোকজনদের আর্তনাদ-চিৎকারে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীরা আরও ক্ষেপে গিয়ে বাসে আগুন দিয়ে সবাইকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনাও করে। 

এই হামলায় আহত ক্র্যাব সদস্য সাংবাদিক এস এম ফয়েজ মাধবদী থানায় পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে অজ্ঞাত কয়েকজনসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। এসময় ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল ও সাধারণ সম্পাদক এস এম বাদশা, সহ-সভাপতি জিয়া খানসহ অন্যান্য ক্র্যাব নেতা ও সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি হামলায় যুক্ত থাকা আলাল সরকার (২৬) ও রনি মিয়া (২৫) নামে দুজনকে পুলিশ আটক করে। পরে সেই মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ দেখে রিফাত নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন ক্র্যাব সদস্য বলেন, সাদা পাঞ্জাবি পরা ছিল এক সন্ত্রাসী, ঘটনার সূত্রপাত তাকে নিয়ে। পার্কিংয়ে থাকা বাসের ড্রাইভার ও তাদের লোকজনদের কাছ থেকে পুরো সন্ত্রাসী কায়দায় মারমুখি হয়ে পার্কিংয়ের নির্ধারিত মূল্যের পাশাপাশি অতিরিক্ত চাঁদা দাবি করে।এই চাঁদাবাজির প্রতিবাদ জানান উপস্থিত ক্র্যাব সদস্যরা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাঞ্জাবি পরা সন্ত্রাসী তাদের দলবল খবর দিয়ে সাংবাদিকদের ওপর পুরোপুরি হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায় এবং রক্তাক্ত করে। 

তারা বলেন, হামলার সময় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমরা অনেক নিবৃত করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সেসব সন্ত্রাসী আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে হামলা চালায়। আল্লাহ মহান। আরও বড় ঘটনা ঘটার আশঙ্কা ছিল। বাসের ভেতর সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্য নারী ও শিশুরা ছিল। সন্ত্রাসীরা বাসে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল।

মামলার এজাহারে যা বলেছেন বাদী
সাংবাদিক এস এম ফয়েজ মামলার এজাহারে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)-এর পক্ষ থেকে ফকির ফ্যাশন-ক্র্যাব ফ্যামিলি ডে (২০২৬) উদযাপন করার জন্য আমি ক্র্যাব সদস্যসহ তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে ২৬ জানুয়ারি সকালে ড্রিম হলিডে পার্কে উপস্থিত হই। সংগঠনের পক্ষ থেকে পিকনিকে ১২টি বাস ড্রিম হলিডে পার্কের বিপরীতে মাধবদী থানাধীন মেহেরপাড়া ইউনিয়নের চৈতাব সাকিনস্থ জনৈক হারুনের মালিকানাধীন আলী গাড়ি পার্কিং নামক স্থানে রাখা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলে পর্যায়ক্রমে ক্র্যাব সদস্য ও তাদের পরিবার-পরিজন নির্দিষ্ট বাসে আসন গ্রহণ করেন। তখন আমাদের ১২টি বাসের মধ্যে ৮টি বাস ২০০ টাকা করে পার্কিং ফি দিয়ে চলে গেলেও ৪টি বাস অপেক্ষমাণ ছিল। পরে আনুমানিক পৌনে ৭টার দিকে দৈনিক পত্রিকা নয়া দিগন্তের সাংবাদিক মনির হোসেনকে বহনকারী বাসের ড্রাইভার ও হেলপারের সঙ্গে আলী গাড়ি পার্কিংয়ের মালিক মামলার তিন নম্বর আসামি মো. হারুন মিয়া (৫২) ও তার সন্ত্রাসী সাঙ্গু-পাঙ্গুরা ৬০০ টাকা দাবি করে। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হলে সাংবাদিক মনির পার্কিং চার্জ আদায়ের রশিদ চান, তখন তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি শুরু হয়। 

তাৎক্ষণিকভাবে মনিরকে বাঁচাতে আমিসহ অন্যান্য সাংবাদিক এগিয়ে গেলে সেই হারুন (৫২) তার ছেলেসহ সন্ত্রাসী বাহিনী ধারালো অস্ত্র, লাঠি, সোঁটা নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের রক্তাক্ত করে। হারুনসহ উপস্থিত সন্ত্রাসীরা বাসের চাবি কেড়ে নেয় এবং বাসে আগুন দিয়ে শিশু-পরিবারসহ আমাদের পুড়িয়ে মারবে বলে প্রকাশ্যে জীবননাশের হুমকি প্রদান করে। এই ঘটনায় এস এম ফয়েজসহ একাধিক সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। 

আহত সাংবাদিকরা হলেন— শহিদুল ইসলাম শাহেদ (সিনিয়র রিপোর্টার, খবর সংযোগ), মহসিন কবির (সিনিয়র রিপোর্টার, জিটিভি), সোহেল নয়ন (ক্রাইম চিফ, এশিয়ান টিভি)। এছাড়া হামলায় ক্র্যাব স্টাফ লাল মিয়াও আহত হন। সেই সময় সাংবাদিকদের বাঁচাতে গিয়ে আহত হন সাখাওয়াত কাউছার (সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

নরসিংদীর মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পরে  সাংবাদিকদের ওপরে হামলার ঘটনায় রিফাত মিয়া নামে আর একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে নিয়ে এই পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাস্থলের চতুর্পাশের সব সিসি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করে দফায় দফায় দেখা হচ্ছে। এ হামলার ঘটনায় আর কারা কারা জড়িত ছিল, এ পর্যবেক্ষণের সূত্র ধরে রিফাতকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সালাম দিয়ে করানো হয় গাড়ি পার্কিং, যাওয়ার সময় চাঁদার দাবিতে দেখায় ভয়ঙ্কর রূপ
এদিকে ঘটনাস্থলের স্থানীয় একটি সূত্রে জানা যায়, হলিডে পার্কের বিপরীতে যে খালি জায়গা আছে সেটার মালিক হারুন নামে এক ব্যক্তি। তিনি তার মাদকাসক্ত সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সেই খালি জায়গায় পার্কে ঘুরতে আসা লোকজনদের যানবাহন পার্কিং করিয়ে ইচ্ছামতো প্রতি গাড়ি থেকে চাঁদা আদায় করে থাকেন। 

সূত্রটি জানায়, যারা প্রাইভেটকার ও নামিদামি গাড়ি নিয়ে হলিডে পার্কে আসে, মালিক ও চালকদের প্রথমে সালাম দিয়ে বিনয়ীভাবে সেই হারুনের খালি জায়গায় তার সন্ত্রাসী বাহিনী যানবাহনগুলো পার্কিং করায়। প্রথমে মিষ্টি ভাষায় যানবাহনগুলো পার্কিং হলেও পার্কে ঘোরাঘুরির পর মালিক ও চালকরা যানবাহন নিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইলে সেই সন্ত্রাসীরা তাদের ভয়ংকর রূপ দেখায়। জোরপূর্বক ভয়-ভীতি দেখিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের মতো অনেক বাড়তি টাকা আদায় করে থাকে। পার্কে ঘুরতে আসে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবার-পরিজন শিশু সন্তানদের নিয়ে—এই সুযোগটাই নেয় হারুনের সন্ত্রাসী বাহিনী। তারা জানে পরিবার-পরিজন থাকলে কেউ কথা বাড়ায় না, যদিও মাঝে মাঝে যারা কথা বাড়ায় তাদের বিভিন্ন ভয়ভীতি ও মারধরের ঘটনাও ঘটে।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান গতকাল নরসিংদীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা জানতে পেরে আগে থেকেই জরুরি বিভাগে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা চিকিৎসার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। গতকাল রাতেই আহত সাংবাদিক শাহেদ, সাখাওয়াত কাউছার ও আজ সকালে মহসিন হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে হামলার পরপরই স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন আহত সাংবাদিকরা।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS