মওদুদীবাদী জামায়াতের সঙ্গে আলেমদের কোনো রাজনৈতিক বিরোধ নেই, এ বিরোধ আদর্শিক। তাদের ভুল আকিদার বিষয়ে জাতিকে সতর্ক করা আলেমদের ধর্মীয় দায়িত্ব। আলেমরা তাদের বক্তব্য-লেখনীর মাধ্যমে সেই ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেছেন।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ‘৪৭-এর দেশভাগ থেকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান: আলেম সমাজের ভূমিকা ও আগামীর করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন।
ইসলামী আকিদা সংরক্ষণ কমিটির আহ্বায়ক মুফতি রিজওয়ান রফীকির সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে অনুসন্ধানী লেখক, গবেষক শাকের হোসাইন শিবলি রচিত ‘প্রত্যক্ষ রাজসাক্ষীর বয়ানে জামায়াত-শিবির-মওদুদীবাদের মুখোশ উন্মোচন’ প্রামাণ্য গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
সভায় বক্তব্য দেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মীর ইদ্রিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) মহাসচিব মাওলানা গোলাম মহিউদ্দিন ইকরাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা আজম খান, জমিয়তের প্রচার সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী, ইসলামী ঐক্যজোটের সহ প্রচার সম্পাদক মাওলানা মাহমুদুল হক হাফেজ্জী, যুব জমিয়তের সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী নাসির আহমদ, তরুণ বুদ্ধিজীবি জবান সম্পাদক রেজাউল করীম রনি, ছনটেক মাদ্রাসার শাইখুল হাদিস মাওলানা আবদুল আউয়াল, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির মহাসচিব মাওলানা আতাউর রহমান আতীকি তেজগাঁও মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা লিয়াকত আলী মাসউদ, আরজাবাদ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা সাইফুদ্দীন ইউসুফ ফাহিম, লেখক অনুবাদক মাওলানা আবদুল্লাহ আল ফারুক প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, মওদুদীবাদী জামায়াত-শিবির সবসময় ইসলামের নামে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমান ও জনগণকে বিভ্রান্ত করে আসছে।জামায়াত এক সময় ‘আকিমুদ্দীন’ তথা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কথা বলতো, এখন তারা দলীয় লোগো থেকে সেই শব্দটি সরিয়ে ফেলেছে।
তাদের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এ কথা তারাই স্পষ্ট করেছে যে, জামায়াত ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে রাজনীতি করলেও আদর্শিকভাবে সে পথেই নেই।
জামায়াত মদিনার নয় বরং মওদুদীর ইসলাম কায়েম করতে চায় উল্লেখ করে তারা বলেন, মওদুদীবাদী জামায়াত প্রতিষ্ঠা থেকেই ইসমতে আম্বিয়া (নবীদের পাপমুক্ত ও মর্যাদাশীল অবস্থান) এবং সাহাবীদের মিয়ারে হক (সত্যের মাপকাঠি) মানে না, ইসলাম বিষয়ে তাদের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসই ঠিক নেই। এ কারণে বিশ্বের মূলধারার আলেমরা কখনোই তাদের ইসলামি দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
সম্প্রতি হেফাজত আমির আল্লামা শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ‘ভণ্ড’ আখ্যায়িত করে বলেছেন ‘আমরা জামায়াতকে ইসলামি দল মনে করি না।
তারা কখনও মদিনার ইসলাম চায়নি, তারা চায় মওদুদীবাদ প্রতিষ্ঠা করতে। তাই তাদের সঙ্গে ঐক্য সম্ভব নয়।
ক্ষমতার জন্য জামায়াত-শিবির ইসলামের বিভিন্ন বিধিবিধানের অপব্যাখ্যা করছে অভিযোগ করে আলেমরা বলেন, আবুল আলা মওদুদীর ভ্রান্ত মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত এ গোষ্ঠীটি শুরু থেকেই নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে ইসলামের বিভিন্ন বিধানের অপব্যাখ্যা করে আসছে। কিন্তু এখন ক্ষমতার লোভে তাদের এসব অপতৎপরতা কয়েকগুণ বেড়েছে।বিভিন্ন মসজিদ-মাহফিলে তাদের অপব্যাখ্যার বিষয়ে কথা বলায় ইমাম ও বক্তাদের হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।
ইসলামের নামে তাদের এমন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসের কারণে প্রকৃতপক্ষে শান্তির ধর্ম ইসলামের বদনাম হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে আলেম ও প্রশাসনের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান আলেমরা।
তারা বলেন, এবারের নির্বাচনকে ঘিরেও ইসলামী ঐক্যের নামে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সঙ্গে জামায়াত প্রতারণা করেছে। শুরুতে তারা সব ইসলামী দলকে ইসলাম কায়েমের স্বপ্ন দেখিয়ে শেষপর্যন্ত তাদের স্বভাবজাত মুনাফিকির মাধ্যমে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য ভেঙে দিয়েছে। এভাবেই প্রতিটি নির্বাচনের আগে যুগে যুগে তারা ইসলামপন্থা ও মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করেছে। তারা যদি কোনোভাবে ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায়, তাহলে আমাদের দেশের মসজিদ, মাদরাসা, দাওয়াত-তাবলিগ, তাসাউফ ও সুলুকের কাজ হুমকির মুখে পড়বে— তাই এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
যারা ইসলামের নামে মওদুদীবাদ এবং বিভিন্ন ভ্রান্ত আকিদা পোষণ করে, তাদের আগামী নির্বাচনে ভোট না দেওয়ারও আহ্বান জানান আলেমরা।
শাকের হোসাইন শিবলি রচিত ‘প্রত্যক্ষ রাজসাক্ষীর বয়ানে জামায়াত-শিবির-মওদুদিবাদের মুখোশ উন্মোচন’ প্রামান্য গ্রন্থে জামায়াত-শিবিরের ভ্রান্তি বিষয়ে পাকিস্তান-ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন আলেমদের সাক্ষাৎকার ও তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার আলেমদের খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে।