বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার দলের নীতি তুলে ধরে বলেছেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে পুণ্যভূমি সিলেটে প্রথম নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
দেশ গড়তে ধানের শীষে ভোট চেয়ে তারেক রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক বিজয়ী হলে দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে।
ধানের শীষ নির্বাচিত হলে স্বৈরাচারমুক্ত দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে। তাই ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে হবে।
এসময় উপস্থিত নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে তিনি জানতে চান, তারা ধানের শীষকে জয়যুক্ত করতে পারবেন কি না? জনস্রোত থেকে তখন হাত তুলে ‘হ্যাঁ’ সূচক জবাব আসে। তারেক রহমান এসময় বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ’।
বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ এসময় বিএনপির আগের একটি স্লোগান ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’-এর ব্যাখ্যা দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকারে গেলে মা–বোনদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চায়। সিলেটের বহু মানুষ বিদেশে যায়।
আমরা মানুষকে ট্রেনিং দিতে চাই। কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে চাই।
‘যারা পালিয়ে গেছে, তারা বাকস্বাধীনতা, ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারাই ইলিয়াস আলী, দিনারের মতো শত হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। গুম-খুনের মামলা দিয়ে জর্জরিত করা হয়েছে।’
গত ১৬ বছর এই দেশকে অন্য দেশের কাছে বন্ধক দেওয়া হয়েছিল মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিগত ১৬ বছরে উন্নয়নের নাম করে দেশের জনগণের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।তথাকথিত উন্নয়নের নামে অর্থ লুটপাট হয়েছে। এই অবস্থার উন্নয়ন করতে চাই।
তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো সক্রিয়। দেশে-বিদেশে বসে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তাদের থেকে সচেতন থাকতে হবে। দেশের মানুষ আগেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছে। আগামীতেও জনগণ ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে।
তারেক রহমান বক্তব্যের মধ্যে সমাবেশে আসা কে হজ করেছেন জানতে চান। কয়েকজন হাত ওঠালে তিনি একজনকে ডেকে নেন মঞ্চে। তার নাম এটিএম হেলাল, বাড়ি সুনামগঞ্জে। তারেক রহমান বলেন, ‘এই সুনামগঞ্জের মানুষ আছে এখানে?’ জবাবে অসংখ্য লোক হাত তোলেন। তখন তারেক রহমান বলেন, ‘এই লোক আপনাদের?’ জনতা ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেন।
তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কাবা শরীফের মালিক কে?’ হেলাল তখন বলেন—‘আল্লাহ’। তারেক রহমান বলেন, ‘এই দুনিয়া, পৃথিবীর মালিক কে?’ উত্তর আসে—‘আল্লাহ’, একইভাবে ‘সূর্য-নক্ষত্রের মালিক কে?’, ‘আল্লাহ’, ‘বেহেশত-দোযখের মালিক কে?’, ‘আল্লাহ’ প্রশ্নোত্তর শোনা যায়। তখন তারেক রহমান বলেন, আপনারা সবাই সাক্ষ্য দিলেন, বেহেশত-দোযখ, চন্দ্র, নক্ষত্র, এই পৃথিবী ও কাবার মালিক আল্লাহ।
তিনি একটি দলকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা কি অন্য কেউ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? তাহলে কী দাঁড়াল, একটি দল বেহেশত দেওয়ার কথা বলে, সেটা শিরক হবে না? যার মালিক আল্লাহ, কাজেই আগেই তো আপনাদের ঠকাচ্ছে। নির্বাচন হলে কেমন ঠকানো ঠকাবে? শুধু ঠকাচ্ছে না মানুষকে, যারা মুসলমান, তাদের শিরক করাচ্ছে তারা—নাউজুবিল্লাহ।’
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, প্রিয় ভাই-বোনেরা, কেউ কেউ বলে, ওমুককে দেখেছি, তমুককে দেখেছি। ১৯৭১ সালে লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে প্রিয় মাতৃভূমি। সেই মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার সময় যাদের ভূমিকার কারণে এই দেশের লক্ষ লক্ষ ভাইয়েরা শহীদ হয়েছে, লক্ষ লক্ষ মা-বোনেরা সম্মানহানি হয়েছে, তাহলে তো, তাদের বাংলাদেশের মানুষ দেখেই নিয়েছে।
‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, এই গোষ্ঠী, এই হঠকারিতা, মিথ্যার বিরুদ্ধে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের টেক ব্যাক বাংলাদেশে থাকতে হবে। আমরা দেশকে স্বৈরাচার থেকে মুক্ত করেছি। এখন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। শুধু ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করলে হবে না, মানুষকে স্বাবলম্বী করে নিজের পায়ে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রত্যেক মানুষ যাতে ঠিকভাবে, ভালোভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ যাতে নিরাপদে রাস্তায় চলতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে, এটাই হচ্ছে—টেক ব্যাক বাংলাদেশ।’
তিনি বলেন, আমরা বিগত ১৫ বছর দেখেছি, অমুককে দেখেছি, তমুককে ক্ষমতায় রাখার জন্য, সে জন্যই বলেছি দিল্লি নয়। আমরা দেখেছি, যারা ’৭১ সালে ছিল, তারা ওদের সঙ্গে লাইন মেরেছিল। যাদের কথা একটু আগে বললাম, যারা মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ঠকাচ্ছে। আমরা দেখেছি, তাদের আস্তানা কোথায়—যেমন দিল্লি নয়, তেমন পিন্ডি নয়, নয় অন্য দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।
তারেক রহমান বলেন, আমরা বিশ্বাস করি দেশের সব মানুষ হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস, সে জন্যই আমরা দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে বিশ্বাস করি। কেবল ভোট ও কথা বলার অধিকার নয়, দেশের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে মা-বোনদের, কৃষক-শ্রমিক, যুবকসহ সব শ্রেণির মানুষকে বিএনপি চায় ক্ষমতায় গেলে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে।
‘আরেকটি কথা বলি—আমরা দেখেছি—শহীদ জিয়ার সময়, বেগম খালেদা জিয়ার সময় দেশকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। দেশে কলকারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল, মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল। তাই সবার আগে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ। আগামী ১২ তারিখে ভোটে জিতে নবী করিম (সা.)-এর ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করবো। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’
সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন—বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সিলেট-১ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, চেয়ারম্যানের আরেক উপদেষ্টা ও সিলেট-৪ আসনে দলীয় প্রার্থী ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট-২ আসনের প্রার্থী চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা তাহসিনা রুশদীর লুনা, সিলেট-৩ আসনে দলের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও চেয়ারম্যান উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মালিক, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. এনামুল হক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী প্রমুখ।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে জনসভার মঞ্চে ওঠেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঞ্চে ওঠার সময় হাত তুলে সবাইকে অভিভাবদন জানান তিনি। হাজার হাজার নেতাকর্মীও তাকে হাত তুলে স্বাগত জানান। সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন উপস্থিত নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা। এসময় স্লোগানে-স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে আলিয়া মাদরাসা ময়দান।
এর আগে, বেলা পৌনে ১১টার দিকে কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিএনপির প্রথম নির্বাচনী জনসভার কার্যক্রম।