এনবিআর বিভাজন কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, রাজস্ব দর্শনের রূপান্তর: অর্থমন্ত্রী

এনবিআর বিভাজন কেবল প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়, রাজস্ব দর্শনের রূপান্তর: অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রূপান্তরের অংশ হিসেবে পুরো সংস্থাকে পুনর্গঠন করে দুটি আলাদা বিভাগ গঠন করা কেবল সরকারের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়; বরং এটি রাজস্ব দর্শনের একটি মৌলিক রূপান্তর।’

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এনবিআর আয়োজিত রাজস্ব সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন।এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগে রূপান্তরের সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

বক্তব্যে এনবিআর পুনর্গঠন নিয়ে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা দুই ভাগে বিভক্ত করার মাধ্যমে যে রূপান্তরমূলক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, তা অনেকের মনে কিছুটা অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করতে পারে। তবে আমি তাদের আশ্বস্ত করতে চাই—এই সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করছে আপনাদেরই দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ওপর।নতুন এই পুনর্গঠন আপনাদের আরও ক্ষমতায়িত করবে, কর্মজীবনের স্পষ্ট পথ তৈরি করবে এবং বৃহত্তর পেশাদারিত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে জাতির সেবা করার সুযোগ দেবে।’

নতুন দুই বিভাগের কাজের পরিধি ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ হবে সরকারের প্রধান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা বিশেষজ্ঞ সংস্থা।এটি একটি সুষম, প্রতিযোগিতামূলক ও উন্নয়নবান্ধব করকাঠামো প্রণয়ন করবে। নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি শুধু আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না; বরং আয়কর, ভ্যাট, কাস্টমস, অর্থনীতি, ব্যবসায় প্রশাসন, গবেষণা, পরিসংখ্যান, নিরীক্ষা, হিসাববিজ্ঞান ও আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, গবেষক এবং শিল্প-বাণিজ্য সংগঠনগুলোর বিশেষজ্ঞদের মতামত এতে যুক্ত করা হবে। ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের অভিজ্ঞতা ও চাহিদা জানতে নিয়মিত বিরতিতে বাজেট-পূর্ব ও নীতি-পূর্ব আলোচনার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শ প্রক্রিয়া থাকবে।

অন্যদিকে, ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ হবে সরকারের অ্যাকশন আর্ম। এ বিভাগের মূল কাজ হবে রাজস্ব আদায় করা, কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজ করা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং কর ফাঁকি প্রতিরোধ করা। কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে নির্ভীক ও দেশপ্রেমিক নাগরিকের মতো করসেবা নিশ্চিত করবেন।

দেশের বর্তমান রাজস্ব ব্যবস্থার বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অত্যন্ত নিম্ন কর-জিডিপির অনুপাত। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে আরও কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম সর্বনিম্ন। যেখানে ২০২৩ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ছিল ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে রাষ্ট্রের রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়েনি।

এই ব্যবধান দূর করতে চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঐতিহাসিক ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের তিনটি প্রধান কৌশল হলো—আধুনিকায়ন, করজালের সম্প্রসারণ এবং অংশীদারত্ব।

রাজস্ব প্রশাসনের আধুনিকায়নে শতভাগ ‘এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন’ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, কোনো করদাতাকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যেন কর কর্মকর্তাদের কাছে যেতে না হয়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সম্পূর্ণ কনট্যাক্ট-ফ্রি এবং ফেসলেস রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।

 এরই মধ্যে এনবিআর ই-ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট, ই-ভ্যাট, অ্যাসাইকুডা, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো, কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট ও রিস্ক-বেজড অডিট সিলেকশন চালু করায় কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ অনেক কমেছে। তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনের মাধ্যমে একটি ক্যাশলেস ট্রানজেকশন সিস্টেম ও বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন মন্ত্রী।

পরিশেষে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা পরিচালনার অদক্ষতা দূর করে ক্রমান্বয়ে কর অব্যাহতির সুবিধা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কর ব্যবস্থার আওতা বাড়িয়ে নতুন করদাতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি নিয়মিত করদাতাদের জন্য হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণের জন্য নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়েই দেশের উন্নয়নের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS