সংস্কার নিয়ে ‘ফেনা উঠছে’, প্রয়োজন স্পষ্ট রোডম্যাপ ও জাতীয় ঐক্য

সংস্কার নিয়ে ‘ফেনা উঠছে’, প্রয়োজন স্পষ্ট রোডম্যাপ ও জাতীয় ঐক্য

সংস্কার নিয়ে আলোচনা করতে করতে ‘ফেনা উঠে যাচ্ছে’, অথচ সংস্কার বাস্তবায়নে এখনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সূচি নেই বলে মন্তব্য করেছেন সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নী। তিনি বলেন, গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো ব্যবস্থা নয়, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, অংশগ্রহণমূলক শাসন ও জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাই গণতন্ত্রের ভিত্তি।

শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপের (সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) চামেলী হাউস মিলনায়তনে ‘রিফর্ম ওয়াচ’-এর আওতায় ‘সংস্কার কোথায় দাঁড়িয়ে? অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে এসব কথা বলেন এই সংসদ সদস্য। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এ সংলাপের আয়োজন করে।

সংলাপে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংস্কারের অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

সাবিকুন্নাহার মুন্নী বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে, তাই আশাহীন হওয়ার কারণ নেই।তবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট, সংস্কারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সূচির অভাব এবং জাতীয় ঐক্যের ঘাটতি বড় বাধা হয়ে আছে।

তিনি বলেন, ৫৫ বছর চলে গেলেও আমরা জাতীয় প্রশ্নে এক হতে পারছি না।এত রক্তক্ষয়ের পরও যদি জাতীয় ঐক্য তৈরি না হয়, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।

জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া তরুণদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাদের অবদান ভুলে গেলে চলবে না।

সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন সাবিকুন্নাহার মুন্নী। একইসঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, জনপ্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার আহ্বান জানান।

সংসদীয় কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নোটিশ গ্রহণের সুযোগ সীমিত। এক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেও অনেক সময় সংসদ সদস্যদের অপেক্ষা করতে হয়। অথচ সংসদের প্রতিটি মিনিটে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। সংসদে দীর্ঘসময় ধরে পরস্পরের প্রশংসা ও রাজনৈতিক বক্তব্যের চর্চা কমিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

এই সংসদ সদস্য বলেন, গণতন্ত্রকে শুধু ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্বাচন দিয়ে মূল্যায়ন করলে হবে না। নির্বাচন একটি ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। জনগণের অংশগ্রহণ, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন পূর্ণতা পাবে না।

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সাবিকুন্নাহার মুন্নী বলেন, রাজনীতিতে একসময় আত্মত্যাগ ও জনসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। এখন অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও টেকসই হবে না।

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও কথা বলেন তিনি। তার মতে, শুধু কয়েকজন নারীকে নির্বাচনে বা রাজনৈতিক কাঠামোতে যুক্ত করলেই নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয় না। নারীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে নারীদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি, বুলিং ও মানসিক নিপীড়ন বন্ধেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

এই সংসদ সদস্য বলেন, সমাজের অর্ধেকের বেশি মানুষ নারী হলেও রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। নারীদের নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক সুযোগ বাড়াতে হবে।

সংস্কার বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন সাবিকুন্নাহার মুন্নী। তার ভাষায়, শুধু কাগজে-কলমে সংস্কার লিখে রাখলে হবে না, রাজনৈতিক দল, পরিবার ও সমাজ সব জায়গায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করতে হবে।

তিনি বলেন, সবাই পৃথিবী পরিবর্তনের চিন্তা করে, কিন্তু কেউ নিজেকে পরিবর্তনের কথা ভাবে না। আসুন, আমরা সবাই আগে নিজেকে পরিবর্তন করি।

সংলাপে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম ও জহরত আদিব চৌধুরী, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সদস্য লামিয়া ইসলাম, খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলম, ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া, জাগপা সভাপতি ও সংসদ সদস্য তাসমিয়া প্রধান, সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নি, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী প্রমুখ বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS