সংস্কার অংশগ্রহণমূলক না হলে তা টেকসই হবে না: ড. শরীফ ভুঁইয়া

সংস্কার অংশগ্রহণমূলক না হলে তা টেকসই হবে না: ড. শরীফ ভুঁইয়া

সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রক্রিয়া অংশগ্রহণমূলক না হলে তা টেকসই হবে না বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া।

তিনি বলেছেন, অতীতের মতো একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে তা দেশের জন্য আবারও ক্ষতিকর হতে পারে।সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন প্রয়োজন।

শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপের চামেলী হাউস মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘রিফর্ম ওয়াচ’ এর আওতায় ‘সংস্কার কোথায় দাঁড়িয়ে? অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, বর্তমানে সংস্কার প্রক্রিয়া যে পর্যায়ে রয়েছে, তাতে এটি সবার অংশগ্রহণে হচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। জাতির জন্য এটি দুর্ভাগ্যজনক।কারণ, দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থার ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, এমন সুযোগ বারবার আসে না।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে হাজারের বেশি মানুষ জীবন দিয়েছেন, অনেকে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন এবং অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।এর সঙ্গে আগের ১৭-১৮ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন ও ত্যাগও যুক্ত হয়েছে। ফলে বর্তমান সংবিধান সংস্কার অতীতের সাধারণ সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয় নয়। এ কারণে সংস্কার প্রক্রিয়ায় সর্বস্তরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।

অতীতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পঞ্চম সংশোধনী একতরফাভাবে করা হয়েছিল। সংসদে একটি কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটির সুপারিশ পাশ কাটিয়ে একজন ব্যক্তির ইচ্ছায় সংশোধনী করা হয়। বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণও ছিল না। এর ফল দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়েছে।

ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, সংবিধান শুধু একটি আইনি দলিল নয়, এটি একটি রাজনৈতিক দলিলও। তাই এর স্থায়িত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য সংশোধন বা সংস্কারের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সংস্কার পরিষদ গঠন কিংবা সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে যে পথেই সংস্কার করা হোক না কেন, সেখানে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে সংস্কার পরিষদেও যেমন সব পক্ষের অংশগ্রহণ হচ্ছে না, সংসদীয় প্রক্রিয়াতেও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের উদ্যোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক এবং পুলিশ কমিশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকগুলোই কার্যকর হয়নি।

তিনি বলেন, এসব সাংবিধানিক সংস্কার নয়, বরং আইনি সংস্কারের বিষয়। অথচ আইনি সংস্কারও যদি কার্যকর না হয়, তাহলে কীভাবে আশা করা যায় যে বড় ধরনের সাংবিধানিক সংস্কার সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহির মধ্যে আনবে?

গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি গণভোটের আওতায় ছিল এবং জনগণ এতে সম্মতি দিয়েছে। জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে সাংবিধানিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেছে। ফলে সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে কি না, সে বিষয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ছিল।

তিনি বলেন, জনগণ গণভোটের মাধ্যমে যে ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়েছে, সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে সে বিষয়ে একজন বা দুজন ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

ড. শরীফ ভূঁইয়া আরও বলেন, সংস্কারের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি সংস্কারের প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে প্রক্রিয়াগত সমস্যা থেকেই যাবে এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনও সম্ভব হবে না।

সংলাপে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম ও জহরত আদিব চৌধুরী, বাসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সদস্য লামিয়া ইসলাম, খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলম, ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS