জুলই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারে ঐকমত্যের তাগিদ

জুলই সনদ বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারে ঐকমত্যের তাগিদ

জুলাই জাতীয় সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকলেও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের স্বার্থে সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। তারা বলেছেন, জনগণের রায়কে সম্মান করে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা জরুরি।একই সঙ্গে বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকারসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সংস্কার কোথায় দাঁড়িয়ে? অগ্রগতি, বাধা ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এ সংলাপের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়নে অগ্রগতি, সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

সংলাপে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসাইন সেলিম বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে আলোচনা অনেক হয়েছে, এখন এর বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণ জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো যেসব বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।তবে জনগণের নির্বাচিত সার্বভৌম সংসদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এ বিষয়টি স্পষ্ট থাকা দরকার।

তিনি বলেন, সংস্কার নিয়ে তাড়াহুড়া না করে ধৈর্যের সঙ্গে এগোতে হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে কিংবা ভুল বার্তা দিয়ে এ প্রক্রিয়াকে জটিল করা উচিত নয়। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার জহরত আবিদ চৌধুরী বলেন, সংস্কারের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক সহনশীলতা বাড়াতে হবে। সংসদের বাইরে রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও তা আলোচনার টেবিলে বসে সমাধান করতে হবে। বিরোধী দলগুলোকেও সংস্কার-সংক্রান্ত আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া উচিত।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য। রাজনৈতিক সংঘাত ও অসহিষ্ণুতা দেশের জন্য নেতিবাচক বার্তা তৈরি করে।

গণভোটের রায় উপেক্ষা করলে প্রতারণা হবে
গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় বাস্তবায়ন না করে ভিন্নভাবে সংবিধান সংস্কার করা হলে তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হবে বলে মন্তব্য করেছেন ১১ দলীয় জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান।

তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা, জুলাই সনদ এবং পরবর্তী গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। এই রায়কে সম্মান করেই সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে।

বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া পরিচালনার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তাসমিয়া প্রধান বলেন, দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার পর জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা উপেক্ষা করা উচিত নয়। সংসদে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিরোধী দলের মতামত ও সংশোধনী দেওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ হয়নি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে ব্যাপক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

তিনি বলেন, বিজয়ী ও পরাজিত শক্তির বিভাজন তৈরি করে কোনো রাজনৈতিক দল বা অংশীজনকে আলোচনার বাইরে রাখা উচিত নয়। জুলাই সনদের শুরুতেই কিছু সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, যা সংসদীয় প্রক্রিয়ায় আলোচনা করে সমাধান করা সম্ভব।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং পুলিশ সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে বাহিনীটিকে দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় না করে তার মনোবল ফিরিয়ে আনা জরুরি।

ঐকমত্যের বিষয়গুলো আগে বাস্তবায়নের তাগিদ
বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অন্যতম বড় সংকট রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব। ক্ষমতার পালাবদল সংঘাতের মাধ্যমে নয়, নির্বাচনী ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত। কোনো দলকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি বন্ধ করে সব দলের অংশগ্রহণে সহনশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো আগে বাস্তবায়ন করা দরকার। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদ শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়নের বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন।

খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক কাজী মিনহাজুল আলমও ঐকমত্যের বিষয়গুলো আগে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন। পুলিশকে ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে বের করে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

সংস্কারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ চাইলেন বিশেষজ্ঞরা
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিক বলেন, সংস্কার নিয়ে সরকারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন। কোন সংস্কার কখন এবং কোন অগ্রাধিকারে বাস্তবায়ন করা হবে, তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং রাজনৈতিকীকরণ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং জুলাই সনদে আদিবাসীসহ সব জাতিগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বহু জাতিগোষ্ঠী, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরিন সুলতানা মিলি বলেন, গণতন্ত্র শুধু একটি নির্বাচন নয়; এটি ধারাবাহিক চর্চার বিষয়। ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা এবং পুলিশ ও গণমাধ্যমের সংস্কার জরুরি।

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সদস্য লামিয়া ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে তাদের অংশগ্রহণ এখনও কম। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দায় শুধু সরকারের নয়; বিরোধী দল ও জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও স্থিতিশীলতা না থাকলে দেশে আবারও রাজনৈতিক সংঘাত তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।

সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না; সংস্কার ও গণতন্ত্রের কার্যকর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। সংসদকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করার পাশাপাশি সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য জলি তালুকদার বলেন, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া শুধু আইন পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, তথ্য অধিকার ও পুলিশ সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সমন্বয়ক সারোয়ার তুষার বলেন, গত দুই বছরে একাধিক কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে যে প্রক্রিয়া এগিয়ে জুলাই সনদ ও গণভোট পর্যন্ত পৌঁছেছিল, এখন তার অনেকটাই পিছিয়ে গিয়ে আবার ‘শূন্য থেকে’ আলোচনা হচ্ছে। গণভোটের পর এর প্রশ্ন মানুষ বুঝেছে কি না, এমন বিতর্ক তোলা অযৌক্তিক। গণভোটে ৬৯ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে এখন নতুন করে আলোচনা না করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা উচিত।

সাংবাদিক সোহরাব হোসেন বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের নামে গত দুই বছরে প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের উদ্যোগ যথেষ্ট ছিল না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার অংশীদারত্ব ও সহনশীলতা না বাড়লে আগামী বছরগুলো সংঘাত ও রাজনৈতিক বিরোধে কেটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম, সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া, সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নী, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS