শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশেই র্যাব-১-এর কার্যালয়। মূল ফটক পেরিয়ে প্রধান ভবনের পেছনে গেলে চোখে পড়ে দেয়ালঘেরা একটি দোতলা ভবন। দেয়ালের ওপরে বসানো কাঁটাতার। ভবনটিতে ঢোকার জন্য রয়েছে আলাদা একটি ফটক। সেটি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, দেড় ফুট চওড়া একটি ছোট দরজা। এই দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায়, ছোট ছোট কক্ষ।
এটি হলো র্যাব কার্যালয়ের ভেতরে সেই আলোচিত গোপন বন্দিশালা, যা পরিচিতি পেয়েছে ‘আয়নাঘর’ হিসেবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এখানকার সাতটি কক্ষ ছিল ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’।
ভবনের নিচতলার দরজার পাশেই রয়েছে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে কিছুটা ওপরে ওঠার পর আবার নিচে নামার সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখা যায়, আরও প্রায় ১০টি ছোট কক্ষ। দুই ফুট চওড়া ও চার ফুট লম্বা কক্ষগুলোতে একজন মানুষ শোবার মতো জায়গা নেই। দোতলার পশ্চিম পাশে রয়েছে আকারে তুলনামূলক বড় ১০টি কক্ষ। পশ্চিম পাশজুড়েও রয়েছে আরও দুটি কক্ষ। মোট ২৯টি ছোট কক্ষ রয়েছে এই বন্দিশালায়। এসব কক্ষেই আওয়ামী লীগ আমলে মানুষকে গুম করে আটকে রাখা হতো।
‘আয়নাঘর’ পরিদর্শন
ঢাকার উত্তরায় র্যাব-১–এর সদর দপ্তরের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল বা আয়নাঘর গতকাল শনিবার পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর বিচারপতি, প্রসিকিউটর ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রসিকিউশন টিম, আসামিপক্ষের আইনজীবী, তদন্ত কর্মকর্তা, মানবাধিকারকর্মী নূর খান, মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি এবং সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে সেলটিকে ‘নির্মম টর্চার সেল’ হিসেবে বর্ণনা করে সেখানে গুম, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ তুলে ধরেন তাঁরা।
অনেকে “আয়নাঘর” বিষয়টিকে রূপকথা মনে করতে পারেন; কিন্তু এটি ছিল বাস্তবতা
আমিনুল ইসলাম, চিফ প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
পরিদর্শন শেষে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারকদের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের বিধান রয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল সেই বিধান অনুযায়ী পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিচার শুধু কাগজপত্র ও সাক্ষ্যের ওপর নির্ভরশীল নয়, ঘটনাস্থল পরিদর্শনও বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
টিএফআই সেলকে ‘নির্মম টর্চার সেল’ উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, সেখানে ছোট-বড় ২৯টি কক্ষ রয়েছে। নিচে অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ কক্ষ রয়েছে, যেখানে একজন স্বাভাবিক মানুষের লম্বা হয়ে শোবার সুযোগ নেই। সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা গেছে, এসব কক্ষে মানুষকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর হাত-চোখ বেঁধে আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো।
গুমের শিকার বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও ব্যারিস্টার আরমান এই সেলে ছিলেন উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, কাউকে বিভিন্ন মামলায় দীর্ঘদিন আটকে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হলেও অনেককে হত্যা করা হয়েছে। ইলিয়াস আলীসহ গুমের শিকার আড়াই শতাধিক মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, আটক ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা কিংবা পরিবারকে জানানোর বিধান মানা হয়নি। এতে সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ও ১৬৭ ধারার লঙ্ঘন হয়েছে। বেআইনিভাবে আটক রাখা, হত্যা ও গুম—সবই মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে।
আয়নাঘর রূপকথা নয়, বাস্তবতা
আমিনুল ইসলাম বলেন, অনেকে ‘আয়নাঘর’ বিষয়টিকে রূপকথা মনে করতে পারেন; কিন্তু এটি ছিল বাস্তবতা। এই স্থাপনাই তৎকালীন সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের চরিত্র উন্মোচন করেছে। যাদের সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি ছিল, যারা মাঠপর্যায়ে কমান্ড বাস্তবায়ন করেছে এবং যে রাজনৈতিক শক্তি এসব অপরাধে সহায়তা করেছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা উচিত।
আলামত নষ্টের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, দেয়াল তুলে আলামত গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। দেয়াল সরানোর পর ২৯টি কক্ষ ও নিচের কথিত ‘ডেথ সেল’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আলামত নষ্ট বা গোপনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের ভূমিকাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তবে চিফ প্রসিকিউটর বক্তব্যের বিরোধিতা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। র্যাবের সাত কর্মকর্তার পক্ষে আইনজীবী তাবারক হোসেন বলেন, টিএফআই কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়। এটি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি টাস্কফোর্স, যেখানে র্যাবের দায়িত্ব ছিল সচিবালয়-সংক্রান্ত কাজ। তাই টিএফআই বলতে নির্দিষ্ট কোনো ভবনকে বোঝানো যায় না।
রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, তাঁরা যে স্থানটি দেখেছেন, সেটিই কথিত ‘আয়নাঘর’ কি না, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে। একজন ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে তাঁর বিশ্বাস, এটি পরবর্তীকালে তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
গত ২১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকাজ আরও স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা এবং বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য ট্রাইব্যুনাল এই বিচারিক পরিদর্শনের অনুমতি দেন। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ঢাকা সেনানিবাসে ডিজিএফআইয়ের কার্যালয়ে থাকা আরেকটি ‘আয়নাঘর’ আগামী শনিবার পরিদর্শন করা হবে।
টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।