প্রাচীন মিসরীয়দের বিড়ালপ্রেম ইতিহাসে সুপরিচিত। ফারাওদের যুগের হাজার হাজার বছর পরও তাদের রেখে যাওয়া অসংখ্য বিড়াল-সম্পর্কিত নিদর্শন আজও টিকে আছে।তারা অগণিত বিড়ালকে মমি করে সংরক্ষণ করেছিল। এমনকি প্রায় দুই হাজার বছর পুরোনো বিশ্বের প্রথম পরিচিত পোষা প্রাণীর কবরস্থানও তৈরি করেছিল, যেখানে লোহার ও পুঁতির কলার পরানো বহু বিড়ালের কবর পাওয়া গেছে।
প্রশ্ন হলো, প্রাচীন মিসরীয়রা বিড়ালকে এতটা গুরুত্ব দিত কেন? কেন প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস লিখেছিলেন, পরিবারের কোনো বিড়াল মারা গেলে শোকের চিহ্ন হিসেবে মিসরীয়রা নিজেদের ভ্রু কামিয়ে ফেলত?
২০১৮ সালে ওয়াশিংটনের স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব এশিয়ান আর্ট-এ আয়োজিত এক প্রদর্শনী অনুযায়ী, মিসরীয়রা বিশ্বাস করত তাদের দেবদেবী ও শাসকদের মধ্যে বিড়ালের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাদের ধারণায়, বিড়াল একই সঙ্গে স্নেহশীল, রক্ষক ও বিশ্বস্ত; আবার প্রয়োজন হলে স্বাধীনচেতা, আক্রমণাত্মক ও ভয়ংকরও হতে পারে।
এই দ্বৈত বৈশিষ্ট্যের কারণেই বিড়ালকে তারা বিশেষ প্রাণী হিসেবে দেখত এবং তাদের আদলে নানা ভাস্কর্য নির্মাণ করত। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ গিজার মহাস্ফিংক্স।২৪০ ফুট দীর্ঘ এই ভাস্কর্যে মানুষের মুখ এবং সিংহের দেহ রয়েছে। যদিও ইতিহাসবিদরা এখনো নিশ্চিত নন, কেন এটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
কইভাবে শক্তিশালী দেবী সেখমেতকে নারীর দেহ ও সিংহের মাথাসহ চিত্রিত করা হতো। তিনি ভোর ও গোধূলির মতো পরিবর্তনের সময়ে রক্ষাকারী দেবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আরেক দেবী বাসতেতকে অনেক সময় সিংহী বা গৃহপালিত বিড়ালের রূপে উপস্থাপন করা হতো। মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল, বিড়াল তার কাছে পবিত্র।
শুধু ধর্ম নয়, ছিল বাস্তব উপকারও
গবেষকদের মতে, ইঁদুর ও সাপ শিকারে দক্ষ হওয়ার কারণেও বিড়াল মিসরীয়দের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের প্রতি ভালোবাসা এতটাই ছিল যে, অনেক শিশুদের নাম বা ডাকনাম রাখা হতো বিড়ালের নামে। যেমন মেয়েদের জন্য ‘মিট’, যার অর্থই হলো ‘বিড়াল’।
গৃহপালিত বিড়াল ঠিক কবে মিসরে আসে, তা নিশ্চিত নয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকরা খ্রিস্টপূর্ব ৩৮০০ সালের বিড়াল ও বিড়ালছানার সমাধির সন্ধান পেয়েছেন।
শ্রদ্ধার আড়ালে ছিল নিষ্ঠুরতাও
তবে গবেষণায় উঠে এসেছে, এই বিড়ালপ্রীতির সব দিকই মানবিক ছিল না। অনেক প্রমাণ বলছে, খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সাল থেকে খ্রিস্টাব্দ ৩০০ সালের মধ্যে লাখ লাখ বিড়ালছানা শুধু বলি দেওয়ার জন্যই প্রজনন করা হতো। পরে সেগুলো হত্যা করে মমি বানিয়ে মানুষের সঙ্গে সমাহিত করা হতো।
গত বছর সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মমি করা প্রাণীর ওপর এক্স-রে মাইক্রো-সিটি স্ক্যান চালান। এর মধ্যে একটি ছিল বিড়ালের মমি।
যুক্তরাজ্যের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটেরিয়াল রিসার্চের অধ্যাপক রিচার্ড জনস্টন বলেন, স্ক্যানের আগে তারা ধারণাই করতে পারেননি যে মমিটির ভেতরের প্রাণীটি এত ছোট ছিল। কারণ মমিটির প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল কাপড়ে মোড়ানো।
স্ক্যানের পর তারা দেখতে পান, বিড়ালটি মৃত্যুর সময় পাঁচ মাসেরও কম বয়সী ছিল এবং তার ঘাড় ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
অধ্যাপক জনস্টন বলেন, ‘এটি আমাদের জন্য সত্যিই বিস্ময়কর ছিল’। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এমন ঘটনা মোটেই বিরল ছিল না। এসব বিড়ালকে মূলত সেই উদ্দেশ্যেই বড় করা হতো। এটি প্রায় শিল্পপর্যায়ের একটি ব্যবস্থা ছিল। শুধু বিড়াল বিক্রির জন্য আলাদা খামারও ছিল।
দেবতাকে সন্তুষ্ট করার বিশ্বাস
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মিসরীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ মেরি-অ্যান পলস ওয়েগনার এর আগে বলেছিলেন, এসব বিড়ালকে দেবতাদের উদ্দেশে উৎসর্গ হিসেবে নিবেদন করা হতো। প্রার্থনার পাশাপাশি দেবতাদের সন্তুষ্ট করা বা তাদের সাহায্য পাওয়ার আশায় এই প্রথা অনুসরণ করত মানুষ।
তবে মানুষ কেন অর্থ দিয়ে বিড়াল কিনে সমাধিতে সঙ্গে রাখতে চাইত, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, শ্রদ্ধা আর অন্ধ আসক্তির মধ্যকার সীমারেখা অনেক সময় খুবই সূক্ষ্ম ছিল।