মাত্র ছয় হাজার পাউন্ড খরচ করে প্রথম সিনেমা বানাতে হয়েছিল। সেই সিনেমা আজকের মতো বড় পরিসরে মুক্তি দিতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সিনেমাটি আয় করেছিল মাত্র ৪৮ হাজার ডলার। সেই একটি সিনেমাই আজকের আলোচিত ‘দ্য অডিসি’র সিনেমার পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের ভাগ্য বদলে দেয়।
বর্তমানে নোলানের ‘দ্য অডিসি’ মুক্তির পরই বক্স অফিসের শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে। সিনেমাটি অল্প সময়েই বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু এই নির্মাতার শুরুটা ছিল বন্ধুর। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাঁকে আজকের জায়গায় আসতে হয়েছে।
নোলানের প্রথম সিনেমা ‘ফলোয়িং’। অপেশাদার অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে শুটিং করা। অভিনেতারা সবাই চাকরি করায় শুটিং হতো ছুটির দিনে। সেই সিনেমা ১৯৯৮ সালেই নজরে পড়ে হলিউডের বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্নার ব্রসের। এরপর আর কোনো সিনেমা নির্মাণ করতে কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। বড় বাজেটের সব সিনেমা নির্মাণ করে সাড়া জাগিয়েছেন বক্স অফিসে। তাঁর সিনেমার আয় ছয় বিলিয়ন ডলারের বেশি।

চার বছর পর
১৯৯৮ সালের হংকং চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ফলোয়িং’ সিনেমাটি প্রদর্শনের পর নোলান জানান, দ্বিতীয় সিনেমা ‘মেমেন্টো’র কথা। সিনেমাটি চার বছর পর মুক্তি পায়। এটি নোলানকে বিশ্ব সিনেমার অন্যতম আলোচিত নির্মাতায় পরিণত করে। এরপর ২০০৬ সালে আসে আরেকটি আলোচিত সিনেমা ‘দ্য প্রেস্টিজ’। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে নতুন অধ্যায়ের শুরু হয় হয় ‘দ্য ডার্ক নাইট’ বানিয়ে। নোলান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি মূলত ব্যাটম্যান ট্রিলজি নির্মাণে রাজি হয়েছিলেন বড় বাজেটের মৌলিক সিনেমা বানানোর সুযোগ পাওয়ার জন্য। তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন ছিল। তাঁর এই পরিকল্পনা সফল হয়। ব্যাটম্যান বিগিনস তাঁকে হলিউডের আস্থাভাজন নির্মাতায় পরিণত করে। এরপর আসে ‘দ্য ডার্ক নাইট’—যা শুধু সুপারহিরো সিনেমার সংজ্ঞাই বদলে দেয়নি, বরং আইম্যাক্স প্রযুক্তিকে মূলধারায় নিয়ে আসে।
যাওয়া হয়নি ফিল্ম স্কুলে
ফিল্ম নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা থাকলেও দুবার অস্কারজয়ী নোলানের ফিল্ম স্কুলে যাওয়া হয়নি। সাহিত্য নিয়ে পড়ার পর ফিল্ম স্কুলে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু তাঁর সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ফিল্ম স্কুল। প্রত্যাখ্যাত হয়ে বসে থাকেননি, উইকেন্ডে বন্ধুদের নিয়েই নিজের মতো করে শুটিং করতেন।
শৈশব থেকে স্বাধীনভাবে ফিল্মে কাজ করতে পছন্দ করতেন। চাইতেন সিনেমার ভ্রমণ যেন দীর্ঘ সময়ের হয়। এখনো তিনি বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় পরিচালকদের একজন। তাঁর পছন্দের নির্মাতাদের একজন অরসন ওয়েলস। নোলান একবার বলেছিলেন, ‘আমি যদি কারও স্বপ্ন চুরি করতে পারতাম, তাহলে অরসন ওয়েলসের স্বপ্ন চুরি করতাম।’
হলিউডে প্রতিবছর হাজারো তরুণ সিনেমা বানাতে আসেন। তাঁদের ৯৯ ভাগই কূল খুঁজে পান না, হারিয়ে যান। সেভাবে নিজেকে দেখতে চাননি নোলান। এরপরের গল্প মেধা ও সংগ্রামের। যা আজ ৬ হাজার পাউন্ডের এক নির্মাতা থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যে নিয়ে গেছেন।
ফিল্ম স্কুলে না গেলেও নোলানের সফলতার গল্পের শুরু ছাত্রাবস্থা থেকে। সেই সময়েই তিনি বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সময়ই জেনে গিয়েছিলেন, নিজেকে প্রমাণ করতে না পারলে কেউ দাম দেবে না। ছুড়ে ফেলবে। নিজের স্বল্প পরিমাণ ভিত তৈরি না হলে যত বড় স্বপ্নই হোক, কেউ পাত্তা দেবে না। কারণ, হলিউডে প্রতিবছর হাজারো তরুণ সিনেমা বানাতে আসেন। তাঁদের ৯৯ ভাগই কূল খুঁজে পান না, হারিয়ে যান। সেভাবে নিজেকে দেখতে চাননি নোলান। এরপরের গল্প মেধা ও সংগ্রামের। যা আজ ৬ হাজার পাউন্ডের এক নির্মাতা থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যে নিয়ে গেছেন।
নোলানের প্রেরণা
ক্রিস্টোফার নোলান বারবার বলেছেন, তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের দর্শন গড়ে উঠেছে বিশ্বের কয়েকজন কিংবদন্তি পরিচালকের কাজ দেখে। তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন স্ট্যানলি কুবরিক, মাইকেল ম্যান, রিডলি স্কট এবং অরসন ওয়েলস। কুবরিকের গল্প বলার গভীরতা ও ভিজ্যুয়াল ভাষা, মাইকেল ম্যানের বাস্তবধর্মী নির্মাণ, রিডলি স্কটের বিশ্ব নির্মাণের দক্ষতা এবং ওয়েলসের সাহসী চলচ্চিত্রভাষা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। নোলানের প্রিয় চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে ‘টু থাউজেন্ড অ্যান্ড ওয়ান: আ স্পেস ওডিসি’, ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’, ‘ব্লেড রানার’, ‘চায়নাটাউন’, ‘স্টার ওয়ার্স: এপিসোড ফোর-আ নিউ হোপ’, ‘টুয়েলভ অ্যাংরি মেন’।
তরুণদের উদ্দেশে নোলান
নোলান তরুণদের সব সময় বলেন, ‘আপনি যদি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে চান, তাহলে উপভোগের সঙ্গে একটি সিনেমা তৈরি করুন। এটা নিয়ে পরে এই হবে, সেই হবে, কী হবে না হবে—এগুলো ভাবা বন্ধ করুন। আপনি যেটা নিজে বিশ্বাস করেন, সেটা করুন। সিনেমাটি বানান। আপনাকে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। বড় স্বপ্ন দেখতে ভয় পেলে চলবে না। ভালো কাজের চেষ্টা সব সময় চালিয়ে যেতে হবে।’

নোলানের পারিশ্রমিক
কেন তিনি হলিউডের সবচেয়ে দামি নির্মাতাদের একজন? ক্রিস্টোফার নোলান শুধু নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নেন না। সিনেমা থেকেও তিনি লাভের অংশও নেন। এর আগে ডানকার্ক থেকে তিনি প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম এবং আয়ের অংশ পাওয়ার চুক্তি করেছিলেন। এ ছাড়া ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমা নিয়ে ইউনিভার্সালের সঙ্গে এমন চুক্তি করেন, যেখানে তিনি প্রথম আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ পান। ছবিটি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় করায় নোলানের মোট আয় ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছিল। এ ছাড়া ইনসেপশন সিনেমার জন্য তিনি প্রায় সাত কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন। নোলানের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
নোলানের সিনেমার বৈশিষ্ট্য
ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, জটিল গল্পকে বুদ্ধিদীপ্ত ও দৃষ্টিনন্দনভাবে উপস্থাপন করা। তাঁর চলচ্চিত্রে সময়, স্মৃতি, স্বপ্ন, পরিচয়, অপরাধবোধ, সময়-বিচ্ছেদ এবং মানব মনের সংকট বারবার ফিরে আসে। বাস্তব লোকেশনে শুটিং, আইম্যাক্স ক্যামেরার ব্যবহার এবং সীমিত কম্পিউটার গ্রাফিকস তাঁর নির্মাণশৈলীকে আলাদা করেছে। তিনি একই সঙ্গে বাণিজ্যিক সাফল্য ও শৈল্পিক গভীরতার সমন্বয় ঘটান। অরৈখিক (নন-লিনিয়ার) গল্প বলার কৌশল, বাস্তবধর্মী অ্যাকশন, শক্তিশালী সাউন্ড ডিজাইন এবং দর্শককে শেষ পর্যন্ত ভাবতে বাধ্য করার ক্ষমতা নোলানের চলচ্চিত্রকে সমকালীন হলিউডে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। নোলানের সিনেমা সফলতার গোপন সূত্র কী? এই নিয়ে তিনি নিউইয়র্ক টাইমসের সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তিনি শুটিংয়ে দ্বিতীয় ইউনিট ব্যবহার করেন না, এমনকি প্রতিটি শট নিজেই তদারকি করেন। ডিজিটালের বদলে ফিল্মে শুটিং করতে ভালোবাসেন।
নোলানের সিনেমার আরেকটি বৈশিষ্ট্য তাঁর চরিত্রগুলো কখনোই স্রেফ সাদা–কালো হয় না। তিনি চেষ্টা করেন চরিত্রগুলো বাস্তবধর্মী করে তুলতে। বাস্তবে যেমন সব মানুষের মধ্যে ভালো–খারাপ থাকে; তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলোও তেমনি।
নোলানের সিনেমার আরেকটি বৈশিষ্ট্য তাঁর চরিত্রগুলো কখনোই স্রেফ সাদা–কালো হয় না। তিনি চেষ্টা করেন চরিত্রগুলো বাস্তবধর্মী করে তুলতে। বাস্তবে যেমন সব মানুষের মধ্যে ভালো–খারাপ থাকে; তাঁর সিনেমার চরিত্রগুলোও তেমনি।
আইএমডিবি ও নেটফ্লিক্স
২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, আইএমডিবির সেরা ২৫০ চলচ্চিত্রের তালিকায় নোলানের আটটি ছবি রয়েছে—যা একজন পরিচালকের জন্য সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বের রেকর্ডগুলোর একটি। নোলান বিশ্বাস করেন, সিনেমা বড় পর্দার জন্যই তৈরি। তিনি প্রকাশ্যে নেটফ্লিক্সের মুক্তি নীতির সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন, তিনি এমন চলচ্চিত্রই বানাতে চান, যা প্রথমে সিনেমা হলেই মুক্তি পাবে।
কেন তিনি আলাদা
ক্রিস্টোফার নোলান এমন সময়ে সিনেমা নির্মাণ করছেন, যখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভিএফএক্স চলচ্চিত্রের ভাষা বদলে দিচ্ছে। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, দর্শক এখনো বড় পর্দায় বাস্তব অনুভূতি খোঁজেন। তাই তাঁর ছবিতে থাকে বাস্তব লোকেশন, আইম্যাক্স ক্যামেরা, সীমিত কম্পিউটার গ্রাফিকস এবং জটিল কিন্তু আবেগনির্ভর গল্প। মাত্র ছয় হাজার পাউন্ড দিয়ে শুরু করা সেই তরুণ আজ শুধু সফল পরিচালক নন, তিনি প্রমাণ করেছেন একজন নির্মাতার নামও একটি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: আইএমডিবি, ভ্যারাইটি ও নিউ ইয়র্ক টাইমস