‘আমাগে রাস্তাডা মেলা খারাপ। গাড়ি চালাতি গেলি পরানডা চলি যাতি চায়।বড় বড় গর্তে এহন গাড়ি চলতিছে না প্রায় এমন অবস্থা। কোনো নেতা এটা বাত্তানতিও আসতিছে না।কি ওরবো? কেউ তো আমাগে জন্যে কিছুই করতেছে না।’
খুলনার রূপসা উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কের ভগ্নদশা তুলে ধরে আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন ভ্যানচালক মফিজুর রহমান।
তিনি জানান, সড়কের বেহাল দশার কারণে একদিকে গাড়ির চাকাও শেষ হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে চালকের মাজাও শেষ হয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের মাজারের সামনের সড়কে কথা হয় বাগমারা এলাকার এই ভ্যানচালকের সঙ্গে।এসময় তিনি বাংলানিউজের কাছে সড়কের বেহাল দশা ও চালকসহ যাত্রীদের নানা ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন।
সড়ক সংলগ্ন চর রূপসার পাওয়ার হাউজ মোড়ের বাসিন্দা শাহারুজ্জামান শাওন বলেন, দেড় যুগ সংস্কার না করায় বিশাল বিশাল গর্ত আর খানাখন্দে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়ক। পিচ ঢালাই দেওয়া রাস্তাটি এখন কাদামাটির রাস্তায় পরিণত হয়েছে। বর্তমান বর্ষা মৌসুমে কাদামাটিতে এটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের নিত্যদিনের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সড়কটির বেহাল দশার কারণে চালকরা ঠিকমতো গাড়ি চালাতে পারে না। গর্তের কারণে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা।
আক্ষেপ করে শাওন বলেন, কোনো সরকারই এই সড়কটির বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এলজিইডি মাঝে মাঝেই রাস্তার কাজ শুরু হবে বলে পরিমাপ করে কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তা মাপ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। অতিসত্বর আরসিসি ঢালাই রাস্তা হোক, এটা আমাদের দাবি।
নিউফিশ এলাকার বাসিন্দা মাকসুদা বেগম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কটি এখন আর চলাচলের মতো নেই। নিয়মিত কিডনি রোগীকে ডায়ালাইসিস করাতে শহরে আনা সম্ভব হয় না এ সড়ক দিয়ে। যে কারণে বেশি ভাড়া দিয়ে খুলনায় থাকতে হচ্ছে।
একই এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ বলেন, শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এ সড়ক। অথচ বর্তমানে এই রাস্তায় চলাচল করা মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। ছেলে-মেয়েরা ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে পারে না, তাই এলাকার নিজের বাড়ি ছেড়ে রূপসা কলেজ রোডে ভাড়া বাসায় থাকছি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় দেড় যুগ ধরে অতি গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির এমন বেহাল দশা। বিগত বছরগুলোতে জনপ্রতিনিধিরা বারবার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সড়কটির কোনো উন্নয়ন হয়নি।
সড়কটিতে চলাচল করা গাড়ির চালকরা বলছেন, প্রতিদিনই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে—কখনো বেয়ারিং, কখনো এক্সেল বা স্প্রিং ভেঙে যাচ্ছে। আয়-রোজগারের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মেরামতে। সড়কের বেহাল অবস্থা থাকায় যাত্রীরাও ভিন্ন পথে যাতায়াত করছেন। ফলে তাদের আয় কমছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপসা ফেরিঘাট (বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়ক) থেকে খানজাহান আলী (র.) সেতু সংলগ্ন জেমিনি সি-ফুড পর্যন্ত এলজিইডির আওতাধীন সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পূর্ব রূপসাবাসীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রাস্তাটি বর্তমানে খানাখন্দ, কাদা ও পানির কারণে চরম দুর্ভোগের কারণে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রতিদিন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও মাছ কোম্পানির শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। তাছাড়া বৃষ্টির কারণে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, যার কোনো কোনোটি দুই-তিন ফুটেরও বেশি গভীর। বৃষ্টি হলেই এসব গর্তের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ফলে চালকদের যেমন সীমাহীন কষ্টের মধ্যে পথ চলতে হয়, পথচারীদের হাঁটাচলাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।
নৈহাটি ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইলিয়াজ হোসেন জানান, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়ক বর্তমানে চরম বেহাল অবস্থা। এক কথায় বলতে গেলে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে সড়কটি। এতে করে প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করা যানবাহন ও সাধারণ মানুষকে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ বার সড়ক বিভাগ সড়কটি সংস্কারের জন্য মেপে গেছেন। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
যে কারণে সড়কের এ পরিণতি
রূপসা ফেরিঘাটের পূর্বপাড়ের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও বীর বিক্রম মহিবুল্লাহর সমাধি কমপ্লেক্সের ঠিক পাশ দিয়ে রূপসা সেতুর দিকে চলে যাওয়া বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় যানবাহন চলাচল, এমনকি হেঁটে চলাচলেরও অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সড়কটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীন। তবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা সড়কটি কাগজপত্রে ‘ভিলেজ রোড-এ’ ক্যাটাগরির। গ্রামীণ সড়কের নকশায় তৈরি সড়কটিতে মাছ কোম্পানির বড় গাড়ি, পাওয়ার প্ল্যান্টের ভারী যানবাহন চলাচল করে। তাছাড়া সড়কের দুই পাশে ইট, বালু, খোয়া, পাথর ও কয়লা ব্যবসায়ীদের গোলা থাকায় সেগুলো পরিবহনে সড়কের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভারী ট্রাক চলাচল করে। সড়কটির দুই পাশে বেশ কয়েকটি হিমায়িত মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিকারক কোম্পানিও রয়েছে। সেগুলোরও রয়েছে ভারী যান। এসবের ফলে সড়কটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সড়কের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে রূপসা নদী। পূর্ণিমার জোয়ারে অধিকাংশ সময় সড়কটি তলিয়ে যায়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়কটির অবকাঠামো।
সড়কটির দুই পাশে যা রয়েছে
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় সবচেয়ে বেশি চিংড়ি চাষ হয়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রপ্তানি খাত চিংড়ি শিল্পের সিংহভাগ কোম্পানি বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কের পাশে অবস্থিত। চিংড়ি হিমায়িত করে প্রক্রিয়াজাতে নিয়োজিত এমন অন্তত ১৫টি কারখানা রয়েছে সড়কটির দুই পাশে। এছাড়া ছোট-বড় অসংখ্য শিল্পকারখানাও রয়েছে। কোস্টগার্ড কার্যালয়, বরফকল, অসংখ্য মাছের ডিপো, ৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুলিশ ক্যাম্পসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে সড়কটিতে।
চর রূপসা, বাগমারা, জাবুসা এলাকার মানুষ যাতায়াতের জন্য সড়কটি ব্যবহার করেন। সড়কের পাশের বিভিন্ন কোম্পানির কয়েক হাজার শ্রমিকও ঝুঁকি নিয়ে এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। কিন্তু সড়কটি যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ভ্যান, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেক সময় যানবাহন কাদায় আটকে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগে থাকতে হয় যাত্রীদের।
সড়ক বিভাগ যা বলছে
জানতে চাইলে রূপসা উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মো. নাজমুল হুদা বাংলানিউজকে বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন সড়কটি সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে ৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার একটি খসড়া তৈরি করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পেলে সড়কটি সংস্কার করা যাবে।