চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শুরুতে ঢাকার অনেক মূলধারার টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যম আন্দোলনের ব্যাপ্তি, সহিংসতা বা জনমতকে সীমিতভাবে তুলে ধরছিল বলে অভিযোগ ছিল। কিন্তু ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব স্ট্রিম, টিকটক ভিডিওর মাধ্যমে ঘটনাস্থলের ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হতে থাকে।বিশেষ করে হতাহত, দমন-পীড়ন ও গণসমাবেশের দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর মূলধারার মিডিয়াগুলোও তাদের ভাষা, ফ্রেমিং ও কভারেজে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। পরে অনেক গণমাধ্যম মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আরও জোরালোভাবে প্রচার শুরু করে এবং টকশো ও বিশ্লেষণেও আগের চেয়ে ভিন্ন সুর দেখা যায়।
আবার সম্প্রতি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে ‘তাজু ভাই ২.০’ বলে পরিচিত এক যুবক অস্পষ্ট-অগোছালো উপস্থাপনে ফেসবুকে সংবাদ প্রচার করে ভাইরাল হন। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি।ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউব শর্টসের মাধ্যমে তার সংলাপ ও উপস্থিতি ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকার বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন নিউজ পোর্টালও তাকে নিয়ে প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে।
উল্লিখিত দুটি ঘটনাই শুধু নয়, এখন হরহামেশাই সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে মূলধারার গণমাধ্যমকে তার অবস্থান বা এজেন্ডায় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমের এজেন্ডা সেটিংয়ের ক্ষমতা সোশ্যাল মিডিয়ার হাতে চলে গেছে এবং মূলধারার মিডিয়াকে সেই ট্রেন্ড অনুসরণ করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রে নানা রকম ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি হয়। এক্ষেত্রে একসময় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রযুক্তির বিকাশে এখন গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। ফেসবুক, ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বর্তমানে তথ্য প্রাপ্তির বড় উৎস হয়ে উঠেছে। সে কারণে মূলধারার গণমাধ্যমের পরিবর্তে বিজ্ঞাপনের বিরাট একটা অংশও চলে যাচ্ছে এসব প্ল্যাটফর্মে।
মূলধারার গণমাধ্যম যেসব তথ্য প্রকাশে সেন্সর আরোপ করে, সেগুলোও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। কারণ, একটি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমকে অনেকগুলো নীতি ও আইন মেনে চলতে হয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কিছু প্রকাশের ক্ষেত্রে নেই কোনো দায়বদ্ধতা। বরং রয়েছে তথ্যের অবাধ প্রবাহ। যার সুযোগ নিয়ে কখনো কখনো ছড়ানো হয় মিথ্যা, অপতথ্য ও গুজব। সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্যের এই অবাধ প্রবাহ মূলধারার গণমাধ্যমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ‘গেট কিপিং’ সিস্টেম নেই। কন্টেন্ট নিয়ে কোনো দায়বদ্ধতাও নেই। যে কারণে বাছবিচারহীন তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই মূলধারার গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া গণমাধ্যমের সহায়ক হিসেবেও কাজ করে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত কন্টেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
আবার অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যম দুটি আলাদা বিষয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সর্বোচ্চ মূলধারার গণমাধ্যমের প্রাথমিক রসদ জোগাতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে পাঠক-দর্শক-শ্রোতারা মূলধারার গণমাধ্যমেই আস্থা রাখেন। সেক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দর্শককে আস্থা রাখতে সহায়ক হতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া বনাম মূলধারার গণমাধ্যমের কনটেন্টের প্রেক্ষাপট
মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্টের আইনগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক এবং মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সহযোগী ডিন ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু।
“সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো ভিউ বা ক্লিকবেইট পাওয়ার জন্য সংবাদ পরিবেশন করলে হয়ত সাময়িক লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমে ক্লিকবেইট সংবাদ পরিবেশন করলে আসলে দিন শেষে দর্শক-শ্রোতারা আস্থা হারিয়ে ফেলেন”—ড. মো. সাইফুল আলম চৌধুরী; সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেসব কনটেন্ট আসছে সেগুলো অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমও ক্যারি (নিউজ) করছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সব খবরই খবর না। ভাইরাল হওয়া বিষয়গুলো হয়ত সাময়িকভাবে মূলধারার গণমাধ্যমও তুলে ধরে। তবে তা গণমাধ্যমের সংবাদ আকারে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সেইসব খবর মূলধারার গণমাধ্যমে স্থান পায় না। গণমাধ্যমের কাজ বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন তৈরি করা। সেসব বিষয় মূলধারার গণমাধ্যম কর্মীদের মাথায় রাখা উচিত। আর সেভাবেই তারা মূলধারার গণমাধ্যমের জন্য কনটেন্ট তৈরি করবেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া খবর পাঠকের কাছে উপস্থাপন করা হলেও আদতে গণমাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মূল ধারার গণমাধ্যম দুটি আলাদা বিষয়। এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। ভাইরাল হলেও গণমাধ্যমে সেই খবরটি দিতে হবে এমন কোনো বিষয় নয়, নারী-শিশুদের নিয়ে ভাইরাল হওয়া বিষয়টি তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। এজন্য আইনি দিকটিও দেখা জরুরি বলে মনে করেন আইনের এই অধ্যাপক।
ক্লিকবেইটনির্ভর সোশ্যাল মিডিয়া, গণমাধ্যমের ভিত্তি ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’
মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে এক করা উচিত হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল আলম চৌধুরী। তিনি ডিজিটাল মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি, গুগল ট্রেন্ডস, ফ্যাক্ট চেক এবং অপতথ্য নিয়ে কাজ করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো ভিউ বা ক্লিকবেইট পাওয়ার জন্য সংবাদ পরিবেশন করলে হয়ত সাময়িক লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমে ক্লিকবেইট সংবাদ পরিবেশন করলে আসলে দিন শেষে দর্শক-শ্রোতারা আস্থা হারিয়ে ফেলেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে কি না– জানতে চাইলে ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, এখন ডিজিটাল যুগ। সুতরাং আপনার এই বিজনেস মডেলটা এখন চেঞ্জ হয়ে গেছে। কারণ, আগে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দেবে কি না বা সরকারি বিজ্ঞাপন পাব কি না সেই চিন্তাটা করতে হতো। আপনার পত্রিকা আছে, তার আইডেন্টিটি আছে। কিন্তু সেটার ডিজিটাল বা অনলাইন সেকশন দিয়ে ইনকামের জন্য এলে বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দেবে কি না… আপনি ডিজিটাল প্লাটফর্মে নিউজ করেন, সেক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন দিক বা না দিক সারা বিশ্বের যেকোনো কোম্পানির বিজ্ঞাপন আপনি পাবেন। ধরেন আপনার একটা ফিচার পাতা আছে ভ্রমণের। আপনি সেখানে বিজ্ঞাপন নাও পেতে পারেন, কিন্তু সেই স্টোরি যদি ডিজিটাল প্লাটফর্মে দেন, সারা বিশ্বের বিজ্ঞাপন পাবেন। এটা হচ্ছে অ্যালগরিদমের যুগ। অ্যালগরিদমের যুগ হওয়ার কারণে এই সুবিধা আছে, বিজনেস মডেলের সুবিধা আছে।
মন্দ দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, অসুবিধাটা হচ্ছে অ্যালগরিদম আসলে আপনার ভালো নিউজকে কিল করে ফেলে। যেমন– আপনি একটা নায়িকাকে নিয়ে স্টোরি করবেন, সেটা হয়তবা খুবই লাইট স্টোরি, সেটা অনেক ভিউ পাচ্ছে, সেটার অ্যালগরিদম বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আপনি একটা ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট করলেন, সেটার অত ভিউ হচ্ছে না। একটা সোশ্যাল প্রবলেম নিয়ে নিউজ করলেন, হিউম্যান ইন্টারেস্টের কারণে জনস্বাস্থ্যের কোনো রিপোর্ট করলেন, সেটা ভিউ পাচ্ছে না। ফলে এখানে একটা সমস্যা আছে।
‘আরেকটা সমস্যা হচ্ছে, এই অ্যালগরিদমটা খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। যারা ব্লগার তাদেরটা ভিন্ন, কিন্তু নিউজ সাইটে প্রতিদিন প্রতি মিনিটে স্টোরি আপ করছেন। আমরা যদি ইউটিউবকে উদাহরণ হিসেবে ধরি, আপনি তিন থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে কয়টা স্টোরি আপ করবেন, সেখানে আপনার কয়টা বিজনেস করবে। সেজন্য এটা একটা সমস্যা। এখানে সবসময় হট কেক বা বার্নিং ইস্যুগুলা ফাইট করতে থাকে। ফলে আপনি যে একটা স্টোরি ইন ডেপথ করে, অনেক পরিশ্রম করে দিচ্ছেন, সেটার সেখান থেকে ইনকাম নাও হতে পারে। কিন্তু ওইদিকটা আপনার জন্য ওপেন। আপনার এখন কারো কাছে যেতে হচ্ছে না। সার্কুলেশন হলো কি হলো না, তা হচ্ছে না। আপনি জানেনও না নাইজেরিয়াতে একজন বাংলাদেশি আছেন, আপনি বাংলায় স্টোরি করেছেন, সেটা তিনি দেখছেন। সেখান থেকে বিজ্ঞাপন আসছে। সুতরাং একদিকে সুবিধা আছে, আরেক দিকে অসুবিধা আছে।’
“গণমাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। মূলধারার গণমাধ্যম একা এজেন্ডা নির্ধারণ করে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও সেখানে ভূমিকা রাখে। মিডিয়া একটা এজেন্ডা তৈরি করলে সামাজিক মাধ্যমে পাবলিক আরেকটি পাল্টা এজেন্ডা তৈরি করতে পারে, যেটি আগে করার সুযোগ ছিল না। যার ফলে এক ধরনের ‘গণতন্ত্রায়ন’ও ঘটেছে”—খোরশেদ আলম; সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এ দুই চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখা যায় কীভাবে– এমন প্রশ্নে ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ব্যালেন্স হচ্ছে আপনাকেই করতে হবে। আরেকটা জিনিস হচ্ছে ভিউ পাওয়ার জন্য আমরা ক্লিকবেইট যেটা বলছি, সেটা করছেন। কারণ ক্লিকবেইট করলে, লাইট স্টোরি করবেন অথবা এক ধরনের ফেব্রিকেটেড হেডলাইন করবেন, এটা দর্শক যখন বুঝে যাবে, কারণ আপনার তো সাবস্ক্রাইবার নির্ভর, ফলোয়ার্স নির্ভর। সাবস্ক্রাইবাররা যখন বুঝবে… আপনি দেখবেন ৫ আগস্টের পর অনেকে ইউটিউব চ্যানেল করেছে এখান থেকে বা ভারত থেকে, প্রথম দিকে খুব ভিউ পেত, এখন আর পায় না। কারণ কী? তাদের ওই আস্থাটা হারিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আলটিমেটলি নিউজ অর্গানাইজেশন বা ইনফরমেশন বেসড অর্গানাইজেশন আসলে ডিপেন্ড করে তার ট্রাস্টেড অডিয়েন্সের ওপরে। ওই বিশ্বাসযোগ্যতাটা হারালে একসময় কিন্তু আস্তে আস্তে ডাউন, ব্যবসাটা ডাউন হবে। হয়ত ইনস্ট্যান্ট যখন চালু করলেন, তখন অনেক সাবস্ক্রাইবার হলো, তখন আপনি ভিউ পাবেন। সুতরাং, ইটস নট এ গুড বিজনেস মডেল। বিজনেস মডেলের জন্য বিশ্বাসটাই সবচেয়ে, ক্রেডিবিলিটিটাই সবচেয়ে আগে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাবিত করছে গণমাধ্যমকে
গণমাধ্যমের চারটি কাজের মধ্যে অন্যতম এজেন্ডা নির্ধারণ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এজেন্ডা তৈরি করছে। সেজন্য এই মাধ্যমকে সহযোগী বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে কিছু প্রকাশ পেলে তার একটি বড় অংশই আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জানি। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু হলে সেটা মূলধারার গণমাধ্যম ফলো করে। গত কয়েকদিন ধরে আমি দেখেছি (কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর ভাইরাল যুবক) ‘তাজু ভাই ২.০’-কে নিয়ে অনেকে অনুষ্ঠান করেছেন। ফলে মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে নতুন মাধ্যমের একটি পারস্পরিক সম্পর্ক আছে। কারণ এগুলোর একটি আরেকটিকে প্রভাবিত করে।
সাংবাদিকতার এই শিক্ষক বলেন, এটির ফলে গণমাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। মূলধারার গণমাধ্যম একা এজেন্ডা নির্ধারণ করে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও সেখানে ভূমিকা রাখে। মিডিয়া একটা এজেন্ডা তৈরি করলে সামাজিক মাধ্যমে পাবলিক আরেকটি পাল্টা এজেন্ডা তৈরি করতে পারে, যেটি আগে করার সুযোগ ছিল না। যার ফলে এক ধরনের ‘গণতন্ত্রায়ন’ও ঘটেছে।
শুধু কনটেন্টই নয়, গণমাধ্যমের আর্থিক খাতেও ভাগ বসিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া
এনটিভি অনলাইনের সম্পাদক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফকরউদ্দীন জুয়েল মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়া মূলধারার গণমাধ্যমকে শুধু কন্টেন্ট দিয়েই চাপে ফেলেনি, আর্থিক খাতেও ভাগ বসিয়েছে। গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপনেও তারা ভাগ বসাচ্ছে।
তিনি বাংলানিউজকে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটে অবশ্যই গণমাধ্যম চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। কারণ সংবাদটা এখন শুধু আমাদের নিজস্ব প্লাটফর্ম বা আমরা যা প্রকাশ করছি তার ওপরই নির্ভর করছে না। মানুষ কোনো না কোনোভাবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংবাদ পাচ্ছে এবং সেটা যাচাই-বাছাই করার জন্য অনেক সময় গণমাধ্যমের কাছে আসছে। কখনো কখনো যাচাই-বাছাই না করে যেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসছে সেটাকেই বিশ্বাস করছে। গণমাধ্যমের যে গেট কিপিংটা বা ডিস্ট্রিবিউশন প্লাটফর্মটা সেটাও নির্ভর করছে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া না চাইলে আমার কন্টেন্টটাও পাঠকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
“সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের শুধু ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে তা নয়, বরং আমাদের রেভিনিউতেও ভাগ বসাচ্ছে”—ফকরউদ্দীন জুয়েল, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
সোশ্যাল মিডিয়া গণমাধ্যমের আয়েও ভাগ বসাচ্ছে উল্লেখ করে ফকরউদ্দীন জুয়েল বলেন, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের শুধু ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে তা নয়, বরং আমাদের রেভিনিউতেও ভাগ বসাচ্ছে। কারণ গণমাধ্যমও আয় করে, সোশ্যাল মিডিয়াও আয় করে। বিশেষ করে টেক কোম্পানিগুলোর নিউজে কোনো জবাবদিহিতা নেই। কিন্তু মূলধারার গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা আছে। তাই তাকে অনেক কিছু ভেবেচিন্তে প্রকাশ করতে হয়। তার কিন্তু বড় ইনভেস্ট করতে হয় সাংবাদিকদের পেছনে। কিন্তু টেক কোম্পানির নির্ভরতা ডেভেলপার, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার– তাদের ওপর। যেটা তার ইউজার জেনারেটেড কন্টেন্ট সেটা কিন্তু সে ফ্রি পেয়ে যাচ্ছে। আমাদের কন্টেন্ট দিয়ে সে বিজনেস করছে অথচ সেটা সত্য না মিথ্যা সেটা যাচাই-বাছাই করার তাগিদও তার কাছে নেই। মানুষ সত্য জানছে নাকি, মিথ্যা জানছে এটা নিয়েও তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। মানুষ কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া কখনও বিশ্বাস করছে, আবার কখনও বিশ্বাস করছে না। এটা নিয়েও কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। মানুষ সবার আগে যেটা পাচ্ছে সেটা কখনও বিশ্বাস করছে, আবার কখনও করছে না। কয়েক বছর ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ার এ ধরনের কন্টেন্টের কারণে মূলধারার গণমাধ্যম চাপে আছে।
সেন্সরশিপের কারণে মূলধারার গণমাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় ফিল্টারিং করা হয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো সেন্সরশিপ নেই। সেই সুযোগে গণমাধ্যমে অপ্রকাশিত তথ্য যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আসছে, তখন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে কি না– জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে তো সেন্সরশিপ আছেই। গণমাধ্যম মানে গণমানুষের মাধ্যম, কিন্তু আমরা কখনও গণমানুষের মাধ্যম হতে পারিনি। নানামুখী চাপ আমাদের ওপর আছে, সেটা বিজ্ঞাপন দাতাদের চাপ, আমার নিজস্ব একটা সেন্সরশিপ আছে সেটারও চাপ আছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কিন্তু সেই তাগিদটা নেই। সে কারণে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর করছে। মানুষ সেখান থেকে তথ্যটা পেয়ে যাচ্ছে।
আবার বিশেষ বা অনুসন্ধানমূলক তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া উন্মুক্ত হলেও মূলধারার গণমাধ্যমকে এক্ষেত্রে চাপের মুখোমুখি হতে হয়। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (নোয়াব) সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, সাংবাদিকদের কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কারো স্বার্থে আঘাত লাগলে তারা গোয়েন্দা সংস্থা বা সরকারের উচ্চমহলকে ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করে। কর্মীদের নিরাপত্তা ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে অনেক সময় তাকে বাধ্য হয়ে সংবাদ প্রকাশে বাধা দিতে হয়।