পাঁচ বছর বিরতির পর নতুন কাজ নিয়ে আবারও পর্দায় ফিরে এলেন ‘রেহানা মরিয়ম নূর’-খ্যাত নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদ। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সিরিজ কেন্দ্রিক মর্যাদাপূর্ণ উৎসব ‘সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যাল’-এর ‘উইমেন ইন সিরিজ’ বিভাগে বিশ্ব প্রিমিয়ারের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশি সিরিজ ‘অ্যানি’।
এর নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি। সিরিজটির নির্মাণ ভাবনার পাশাপাশি চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন সাদ নিজেই।
সাদের হাত ধরেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো সিরিজ নির্বাচিত হয়েছে ‘সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যাল’-এ। জার্মানির কোলনে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে আগামী ৯ জুন এই মিনিসিরিজের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
‘সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যাল’ জার্মানির প্রথম উৎসব, যা সম্পূর্ণভাবে সিরিজ প্রদর্শনের জন্য নিবেদিত। প্রতি বছর এই উৎসবে বিভিন্ন ঘরানার বৈশ্বিক নির্বাচিত প্রায় ২০টি সিরিজ বড় পর্দায় প্রদর্শিত হয়।
ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী এই সিরিজকেন্দ্রিক উৎসবটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নির্মাতা, প্রযোজক ও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনমেলা হিসেবেও পরিচিত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচিত সিরিজ প্রদর্শিত ছাড়াও শিল্পসংশ্লিষ্ট আলোচনা, কর্মশালা ও নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে নতুন সহযোগিতার সুযোগও তৈরি করে আসছে এই উৎসব।
এই ডিস্টোপিয়া ঘরানার গল্পে, অ্যানি (২৭), ছোট এক শহরের নার্স, একা হাতে তার পাঁচ ভাইবোনকে বড় করার সংগ্রাম চালিয়ে যায়, যখন বাইরের পৃথিবী একটি অদ্ভুত অসুখের মুখোমুখি। যে অসুখে সংক্রমিত পুরুষরা নারীদের প্রতি এক নিয়ন্ত্রণহীন ঘৃণায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। এমন এক ‘হেইট প্যান্ডেমিক’-এর গভীর রাতে, এক মুখোশধারী হামলাকারী অ্যানির ওপর নৃশংস হামলা চালায়। এই সহিংসতা অ্যানিকে বদলে দেয় চিরতরে। নিজের ভেতরে ও চারপাশে জমে থাকা সব ঘৃণার সঙ্গে লড়তে লড়তে, অ্যানি এমন এক অন্ধকারে নিজেকে খুঁজে পায়, যেখান থেকে সে প্রতিশোধ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না।
অ্যানির মতো একজন জটিল চরিত্রের চোখ দিয়ে দেখা এই গল্পটি নির্মাণধারায় একটি ‘চেম্বার ড্রামা’। সাদের অন্য সব কাজের মতোই এটি নারী-পুরুষ সম্পর্কের ভেতরের শাশ্বত অবিশ্বাস, অসমতা আর সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সিরিজে নাজিফা তুষির পাশাপাশি আরও অভিনয় করেছেন ইয়াশ রোহান, সাইমন সাদিক, সারিকা সাবরিন, ফারহানা মিঠু, নাজাহসহ অনেকে।
‘মেট্রোভিডিও’, ‘ক্যাটালগ’, ‘জিরেল’ এবং ‘অডেশাস অরিজিনালস’ এর ব্যানারে সিরিজটি প্রযোজনা করেছেন প্রযোজক এহসানুল হক বাবু, আলি আফজাল উজ্জ্বল, সহ-প্রযোজক শিহাব নূরুন নবী, তুহিন তামিজুল, তানভীর হোসেন, জোহান চ্যাপেলান, সাইফুল ইসলাম, রায়হান সিকদার ও নির্বাহী প্রযোজক অপূর্বা বকশি।
সিরিজের টেকনিক্যাল টিমে আছেন সাদের দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। সিনেমাটোগ্রাফিতে তুহিন তামিজুল, সাউন্ড ডিজাইন ও মিক্সিংয়ে শৈব তালুকদার, কালারিস্ট চিন্ময় রয়, ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর সিয়াম সামস্ তুষ্ট, অ্যাসোসিয়েট প্রোডিউসার মাহমুদুল হাসান সজিব এবং কাস্টিং ডিরেক্টর ইয়াসির আল হক।
‘সেরিয়েনক্যাম্প’ মূলত শুধুমাত্র সিরিজের জন্য নিবেদিত একটি এক্সক্লুসিভ ফেস্টিভ্যাল। আর ‘অ্যানি’র মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক অঙ্গনের এমন একটি সিরিজ-কেন্দ্রিক উৎসবে প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের কোনো সিরিজ।
এ অর্জনের মাধ্যমে দেশের নির্মাতাদের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে বলে মনে করেন প্রযোজক এহসানুল হক বাবু। তিনি বলেন, “একটি সিরিজকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছে দিতে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বাইরে গিয়ে সরাসরি সিরিজ ফেস্টিভ্যালের মাধ্যমেও পৌঁছানো সম্ভব। ‘অ্যানি’র মাধ্যমে আমরা সেই সম্ভাবনার একটি উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছি।”
এর আগে ২০১৬ সালে ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ ছিল আবদুল্লাহ মোহাম্মাদ সাদের প্রথম চলচ্চিত্র। সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালক ও সেরা অভিনেতার পুরস্কার জেতা এই সিনেমা প্রদর্শিত হয় নেদারল্যান্ডসের রটারডাম ও সুইজারল্যান্ডের লোকার্নোর মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে।
২০২১ সালে নির্মাতার দ্বিতীয় সিনেমা ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি করে জায়গা করে নিয়েছিলেন ফ্রান্সের সম্মানজনক কান চলচ্চিত্র উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ‘আঁ সার্তে রিগা’-তে। এটি ছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবে অফিসিয়াল সিলেকশনে বাংলাদেশের প্রথম কোনো চলচ্চিত্র। এছাড়াও বিশ্বজুড়ে ১৫টির অধিক আন্তর্জাতিক উৎসবে জায়গা করে নিয়েছিল সাদের এই নির্মাণ।
দেশের গল্প ও নির্মাণশৈলী এখন আর শুধু চলচ্চিত্র উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক সিরিজভিত্তিক মঞ্চেও নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করেছে, সেটিই প্রমাণ করতে আসছে সাদের ‘অ্যানি’।