জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় শব্দচয়নে আপত্তি নিয়ে হট্টগোল হয়েছে। এ নিয়ে কড়া রুলিং দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।তিনি সদস্যদের সতর্ক করে বলেছেন, সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক নয়, এতে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের সম্মান থাকবে না।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের এমপি ফজলুর রহমান রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর বক্তব্য দেওয়ার সময় বিরোধীদলের সদস্যরা বাধা দিলে এই হট্টগোলের সৃষ্টি হয়।
ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন যে, তাকে ‘পাগলা’ বলে কটূক্তি করা হচ্ছে। এ সময় সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে সদস্যদের শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন।
স্পিকার বলেন, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। এখানে প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়ে এসেছেন।রুলস অব প্রসিডিউর বইটা একটু পড়েন। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না। অতীতে জাতীয় সংসদ সম্পর্কে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে।
সদস্যদের বাকস্বাধীনতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে স্পিকার বলেন, সরকারদলীয় এবং বিরোধী দলের সদস্যের মত এক হবে— এমন তো হতে পারে না। যদি সরকারি দলের কোনো সদস্যের বক্তব্যে আপনাদের আপত্তি থাকে, এরপর তো সময় আছে, আপনারা তার যুক্তি খণ্ডন করুন। কিন্তু বক্তব্যের সময় তাকে ডিস্টার্ব করবেন না।
তিনি আরও বলেন, এই যে শিশুদের মতো আচরণ করছেন, বয়স্ক শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তি— যারা ইতোমধ্যে দাদা হয়ে গেছেন, তাদের নাতিরাও হয়তো গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে? স্পিকার যখন দাঁড়ান, তখন বসে পড়া সবার অবশ্য কর্তব্য।
পরে স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান তার নির্ধারিত বক্তব্য শেষ করেন।
যা নিয়ে হট্টগোল
বক্তব্যের সময় ফজলুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের যোদ্ধাদের আমি ছোট করে দেখছি না। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আমি নিজেও এই আন্দোলনে ছিলাম। শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আমার যুদ্ধ চলবে বলেছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, এটি হলো গণঅভ্যুত্থান। সেই গণঅভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুলনা করতে চায়, আমি বলবো এটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর।
সংসদে স্বাধীনতাবিরোধীদের উদ্দেশ্য করে এই প্রবীণ রাজনীতিক বলেন, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, এদেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে—ততদিন মুক্তিযোদ্ধারা জিতবে, রাজাকাররা কোনোদিন এদেশে জয়লাভ করতে পারবে না।
এসময় তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হওয়ার বিষয়টি নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন এবং একজন শহীদ পরিবারের সন্তান কীভাবে জামায়াতে ইসলামী করতে পারে, সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তখন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যে বলেন, ‘সংসদ সদস্য বয়সে আমার বড়।
তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের কথা বলেছেন; কিন্তু নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আঘাত করেছেন।
আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য— উনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।’
রাজনৈতিক আদর্শ বেছে নেওয়ার অধিকার সবার আছে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘উনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে কি ওনাকে জিজ্ঞেস করে দল করতে হবে? এটি আমার নাগরিক অধিকার। আমি কোন দল করব, কোন আদর্শ অনুসরণ করব— এর ওপর হস্তক্ষেপ করার ন্যূনতম কোনো অধিকার রাষ্ট্র কিংবা সংবিধান কাউকে দেয় নাই। আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি আমার পরিচয় এবং আদর্শ নির্বাচনের ব্যাপারে কথা বলে গুরুতর অপরাধ করেছেন।’