ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ব্যাটম্যান’ ট্রিলজি সিনেমার কারণে তাঁকে হয়তো চিনেছেন অনেক দর্শক। তবে পাঁড় সিনেমা–ভক্তরা জানেন, কেবল বাণিজ্যিক সিনেমা নয়; দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা সময়ে, ভিন্ন চরিত্রে অভিনেতা হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছেন তিনি। সেটা ‘আমেরিকান সাইকো’, ‘দ্য মেশিনিস্ট’, ‘আমেরিকান হাসল’, ‘দ্য বিগ শর্ট’ বা ‘দ্য ফাইটার’ই হোক। জিতেছেন একটি অস্কার, দুটি গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার। এ অভিনেতা আর কেউ নন; ক্রিশ্চিয়ান বেল। আজ ৩০ জানুয়ারি অভিনেতার জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।
জানা–অজানা বেল
ব্রিটিশ অভিনেতা হলেও কোনো সিনেমায় আমেরিকান চরিত্রে অভিনয় করলে সেই সিনেমার প্রচারে সব সাক্ষাৎকারে আমেরিকান উচ্চারণ করেন যেন দর্শক বিভ্রান্ত না হন। চরিত্রের প্রয়োজনে ওজন বাড়ানোতে তাঁর জুড়ি নেই। ‘দ্য মেশিনিস্ট’–এর জন্য ৬৩ পাউন্ড, ‘ব্যাটম্যান বিগিনস’–এর ৮০ পাউন্ড, ‘আমেরিকান হাসল’–এর জন্য ২০০ পাউন্ড ওজন বাড়িয়েছিলেন তিনি। প্রথম অ-আমেরিকান অভিনেতা হিসেবে ব্রুস ওয়েন/ব্যাটম্যান চরিত্রে অভিনয় করেন। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুবই সংবদেনশীল বেল; মেয়ের নাম পর্যন্ত প্রকাশ করেননি।
অভিনয়ে প্রথম ধাপ
ক্রিশ্চিয়ান বেলের জন্ম ১৯৭৪ সালের ৩০ জানুয়ারি, ওয়েলসে। ক্রিশ্চিয়ান বেলের বাবা ছিলেন পাইলট, মা নৃত্যশিল্পী। অভিনেতা মনে করেন তাঁর জীবনে বাবার প্রভাব অনেক বেশি।
‘শৈশবে আমাকে অনেক জায়গায় ঘুরে ঘুরে থাকতে হয়েছে। নতুন শহর, নতুন পরিবেশে খুব দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে হতো। তখন থেকেই অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করার একটা আনন্দ তৈরি হয়। এখনো করি। এই মুহূর্তেও ভাবছি, সাংবাদিক হলে কেমন হতো। এটা আমি থামাতে পারি না। এই কৌতূহলই আমাকে এগিয়ে রাখে। বাবার জীবনদর্শন আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তিনি ছিলেন ভীষণ সৃজনশীল, একদম প্রচলিত ধারার মানুষ নন। তাঁর কাছ থেকেই আমি এই পথের প্রস্তুতি পেয়েছি। তিনি বলতেন, “একঘেয়ে হওয়া পাপ। ভুল হলেও সমস্যা নেই, অন্তত ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করছ।” এই মানসিকতা আমার বড় অনুপ্রেরণা।’
মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি বড় পর্দায় যাত্রা শুরু করেন স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘এম্পায়ার অব দ্য সান’ দিয়ে। ওই সময়ই অভিব্যক্তি দিয়ে নজর কাড়েন। পরের বছরগুলোতে তিনি ছোটখাটো নানা ধরনের চরিত্রে কাজ করেন। তবে ব্যাপক পরিচিতি পান ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আমেরিকান সাইকো’ সিনেমা দিয়ে। এই সিনেমা প্যাট্রিক ব্যাটম্যান চরিত্রে বেলের অভিনয় শিল্প-সমালোচকদের চোখে নতুন এক মানদণ্ড স্থাপন করে।
বড় ছবিতে কাজ করলে দ্বিধা থাকে। কারণ, সেখানে পর্দায় শেষ পর্যন্ত কী আসবে, তার সঙ্গে অনেক মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। ছোট ছবিতে বিনিয়োগ নিয়ে দুশ্চিন্তা কম, তাই কম মানুষ ছবিটাকে নির্দিষ্ট পথে চালাতে চায়। বড় ছবিতে আপনাকে অনেক হিসাব–নিকাশ করে চলতে হয়—কোন জায়গা পর্যন্ত যেতে পারবেন, সেটা বুঝে নিতে হয়।
ক্রিশ্চিয়ান বেল
‘ব্যাটম্যান’ জাদু
২০০৫ সালে ‘ব্যাটম্যান বিগিনস’ দিয়ে বেল খুঁজে পান সেই চরিত্র, যা তাঁকে পুরো বিশ্বের চোখে পরিচিতি এনে দেয়। এরপর আসে এই ট্রিলজির আরও দুই সিনেমা ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ও ‘দ্য ডার্ক নাইট রাইজেজ’। যেখানে তিনি ব্রুস ওয়েইনের চরিত্রে অভিনয় করে সিনেমাজগতের এক নতুন দিক উন্মোচন করেন।
ব্যাটম্যান চরিত্রে তাঁর আয়ও ছিল চোখে পড়ার মতো—এই ত্রয়ী সিনেমায় অভিনয় করে তিনি প্রায় ৫৪ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করেন। সব মিলিয়ে ক্রিশ্চিয়ান বেলের মোট সময়ের পরিমাণ প্রায় ১২০ মিলিয়ন ডলার।

অভিনয়ে বহুমাত্রিকতা
ক্রিশ্চিয়ান বেল শুধু সুপারহিরো সিনেমার জন্য পরিচিত নন। তাঁর চরিত্রগুলো প্রায়ই গভীর, জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং। ‘দ্য ফাইটার’, থেকে ‘ফোর্ড ভার্সেস ফেরারি’ সিনেমায় বারবার নিজেকে ভেঙেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেল এখন তেমন চরিত্রে আগ্রহী নন, যেখানে শারীরিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ‘আমেরিকান হাসল’–এর জন্য বেল প্রায় ২০০ পাউন্ড ওজন বাড়ান। অন্যদিকে সেই বেল আবার ‘থর: লাভ অ্যান্ড থান্ডার’ সিনেমায় যখন হিংসরূপে দেখা দেন, চমকে যেতে হয়। ছবির অনেক তারকার মধ্যেও তিনি আলাদাভাবে নাজর কাড়েন।
সিনেমার সেট প্রাণহীন। স্টুডিওর গণ্ডি যতটা ছাড়ানো যায়, ততই ভালো। যখন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হই—মানসিক বা শারীরিক, যেভাবেই হোক; সেটা উপভোগ করি।
ক্রিশ্চিয়ান বেল
আলো থেকে দূরে
হলিউড তারকাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ক্রিশ্চিয়ান বেল। তিনি সব সময়ই পাদপ্রদীপের আলো থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চান। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বহুবার বলেছেন, নিরুত্তাপ জীবনই তাঁর পছন্দ। কাজ ছাড়া ক্যামেরার সামনে আসতে চান না। সিনেমার প্রচার ছাড়া তাঁর দেখাও সেভাবে পাওয়া যায় না। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে কখনোই বড় তারকা মনে করি না। মনোযোগের কেন্দ্র হতে ভালোবাসি না। নিজের জীবনে আমি খুবই সাধারণ থাকতে চাই। একসময় আমাকে তথাকথিত “মুভি স্টার” চরিত্রের প্রস্তাব দেওয়া শুরু হলো, কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি সেগুলোতেও চরিত্র তৈরি করতে।’

পরিচালনায় ‘না’
অনেকে তাঁর মধ্যে দক্ষ পরিচালনার ছায়া দেখতে পান। তবে অভিনেতা পরিচালক হতে চান না। ‘অনেক পরিচালক বলেন, আমি নাকি পরিচালকের মতো প্রশ্ন করি। কিন্তু পরিচালনা মানে চূড়ান্ত দায় নিজের কাঁধে নেওয়া। আমি একটু একা থাকতে পছন্দ করি, নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে ভালোবাসি। এত মানুষের কাছে জবাবদিহি করা আমি কত দিন পারব, জানি না,’ বলেন বেল।