জাতির এ সন্ধিক্ষণে যখন বেগম খালেদা জিয়ার উপস্থিতি, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই তিনি চলে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে বহুমাত্রিক আলোচনা হতে পারে, তবে যাদের সৌভাগ্য হয়েছিল উনার কাছে যাওয়ার, তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে যদি আমরা বৃহৎ চিত্রটিকে অনুধাবন করতে পারি, সেটিই মনে হয় এ শেষবেলায় আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হবে।
বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চারবার আলোচনায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে যখন প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করার জাতীয় কমিটি হয়েছিল, সে কমিটির আমি সদস্য ছিলাম।
তখন একটি ক্যাবিনেট মিটিংয়ে উনার সঙ্গে আমার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি আলোচনা হয়েছিল যা হয়তো জাতীয় ইতিহাসের নীতিনির্ধারণে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি মাইলস্টোন হিসেবে আছে।
২০০৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ২০০৩ সালে বিদেশি কোম্পানিগুলো বলেছিল বাংলাদেশে তেল ভাসছে, খুব দ্রুত তা আহরণ করে এটাকে ভারত এবং অন্যান্য দেশে রপ্তানি করা উচিত। তখন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী, পতিত প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ৫০ বছরের গ্যাস রেখে বাকিটা আমরা নিরাপদে রপ্তানি করতে পারবো। সে সময় তৎকালীন সরকার একটি জাতীয় কমিটি করেন এবং আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার সদস্য হওয়ার।
তিনি বলেন, এ কমিটির রিপোর্ট যেদিন তৈরি হলো, তার পরদিন উচ্চপর্যায়ের ক্যাবিনেট সাব-কমিটিতে আমাকে কমিটির সভাপতিকে নিয়ে সেখানে ব্রিফ করার আহ্বান জানানো হলো। আমাদের কমিটির প্রধান বলা শুরু করলেন, উনি কিছুক্ষণ বলার পর সাইফুর রহমান সাহেব বললেন, দেবপ্রিয়কে কিছু বলতে বলেন।
সেই বৈঠকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আমি বলা শুরু করলাম। এক মিনিট কী দুই মিনিট আমি বলেছি, প্রধানমন্ত্রী আমাকে থামিকে প্রশ্ন করলেন।
এত তীক্ষ্ম প্রশ্ন, আমি খুব অবাক হয়েছি। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- আপনি বলছেন তাহলে ৫০ বছরের গ্যাস নাই?
দেবপ্রিয় বলেন, আমি একটু হতচকিত হয়ে বললাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে ৫০ বছরের গ্যাস নাই। গ্যাস এটা ক্রমান্বয়ে আবিষ্কার হয়, ক্রমান্বয়ে পাওয়া যেতে পারে। ৫০ বছর হয়তো টিকতে পারবো, কিন্তু একসঙ্গে ৫০ বছরের নাই।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, উনি সঙ্গে সঙ্গে পরের প্রশ্ন করলেন আমাকে।বললেন, তাহলে গ্যাস পাওয়া যাবে কেমন করে? আমি বললাম- গ্যাস আমাদের উত্তোলন করতে হবে, জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে হবে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা রেখে সমুদ্রে বিদেশিদের আনতে হবে। উনি প্রশ্ন করলেন, এ যদি রপ্তানি করেন, তাহলে আয় কত হবে? আমি সত্যি বললাম, আয় খুব বেশি হবে না। এটা আমাদের যা রেমিট্যান্স আয়, তার তিনদিনের সমান।
তখন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান তাকে প্রশ্ন করেন জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, উনি বললেন, গ্যাসপাইপ লাইন কোথা দিয়ে হবে? আমি বললাম, গ্যাস পাইপ লাইন আপনার ভৌগিলিক এলাকার ভেতর দিয়ে হবে। এখানে অন্তর্ঘাত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এখানে নিরাপত্তার বিষয় খুবই প্রকৃত বিষয়।
সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উনি সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের মধ্যে কথা বললেন। উনারা সবাই একমত হলেন গ্যাস রপ্তানির সুযোগ নাই। বাংলাদেশের জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয়ভাবে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ওই মিটিংটি ছিল অত্যন্ত একটি নীতিনির্ধারনী মিটিং।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে মন্তব্য করে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেন, বেগম জিয়া জানতেন কীভাবে তার টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারদের কাছ থেকে টেকনিক্যাল পরামর্শ শুনতে হয়। তিনি প্রশ্ন করতে জানতেন। তিনি আলংকারিক অর্থে প্রশ্ন করতেন না, তিনি প্রশ্ন করতেন যুক্তি দিয়ে। তিনি দেশের স্বার্থে এবং গ্লোবাল কনটেক্সটে টেকনিক্যাল উপদেশ গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নিতেন।
শোকসভায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক যায়যায়দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান, লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম ফয়েজ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, ডেইলিস্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রাশেদ আল তিতুমীর, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সিমিন রহমান, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়।
বক্তব্য না দিলেও শোকসভায় সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং শীর্ষস্থানীয় নেতারা। সভার আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্ল্যাহ এবং সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিন।