গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন

গ্রিনল্যান্ডে ইউরোপীয় সেনা মোতায়েন

গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জোর দাবির মধ্যেই সেখানে ইউরোপের একাধিক দেশ সামরিক সদস্য পাঠাতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ফ্রান্সের ১৫ সদস্যের একটি সামরিক দল গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকে পৌঁছেছে। এছাড়া জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও যুক্তরাজ্যের সামরিক সদস্যরাও এই অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।

ইউরোপীয় দেশগুলোর দাবি, এটি একটি ‘রিকনেসান্স মিশন’ বা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণমূলক অভিযান।তবে কূটনৈতিক মহলে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে একটি শক্ত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে পাঠানো এই বাহিনীকে শিগগিরই স্থল, আকাশ ও নৌ সম্পদ দিয়ে আরও শক্তিশালী করা হবে।

নববর্ষে ফ্রান্সের সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশে ভাষণে ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, গ্রিনল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ এবং একই সঙ্গে ন্যাটোর মিত্র। তাই এর নিরাপত্তায় ইউরোপের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।

ফ্রান্সের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক অলিভিয়ে পোয়েভ দ’আরভোর বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম অনুশীলন। এই অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখানো হবে যে ন্যাটো গ্রিনল্যান্ডে উপস্থিত রয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের মধ্যেই এই সামরিক তৎপরতা শুরু হয়। বৈঠক শেষে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, আলোচনা গঠনমূলক হলেও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে ‘মৌলিক মতপার্থক্য’ রয়ে গেছে।

পরে তিনি ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাবেরও সমালোচনা করেন।

অন্যদিকে ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন। তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ না করলেও বলেন, ডেনমার্কের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হতে পারে। ট্রাম্পের দাবি, রাশিয়া বা চীন চাইলে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারে, যা ডেনমার্ক ঠেকাতে পারবে না, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র পারবে।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ইউরোপীয় সামরিক অভিযানে অংশ না নেওয়ার কথা জানালেও সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ হলে তা হবে ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’।তার মতে, ন্যাটোভুক্ত একটি দেশ যদি অন্য ন্যাটো সদস্যের ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করে, তাহলে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবসান ডেকে আনবে।

এদিকে বেলজিয়ামে রাশিয়ার দূতাবাস আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। মস্কোর অভিযোগ, রাশিয়া ও চীনের হুমকির অজুহাতে ন্যাটো সেখানে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে।

তবে ডেনমার্ক নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন আর্কটিক এন্ডিউরেন্স’ নামের এই যৌথ অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাসংখ্যা মাত্র কয়েক ডজন। প্রতীকী গুরুত্ব থাকলেও তারা কতদিন সেখানে থাকবে, তা স্পষ্ট নয়। জার্মানি বৃহস্পতিবার একটি এ৪০০এম পরিবহন বিমানে ১৩ জন সেনা পাঠাচ্ছে, যারা শনিবারের মধ্যেই ফিরে আসবেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা।

ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে আগামী সময়ের জন্য সেখানে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে আর্কটিক অঞ্চলে ন্যাটোর অবস্থান জোরদার করা, যা ইউরোপীয় ও ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক উভয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেছেন, তার দেশ বর্তমানে একটি ভূরাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে জনগণকে যদি বেছে নিতে বলা হয়, তারা যুক্তরাষ্ট্র নয়, ডেনমার্ককেই বেছে নেবে। তার ভাষায়, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানায় যেতে চায় না, শাসনের অধীনেও থাকতে চায় না।

বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেখানে প্রায় ১৫০ সেনা কর্মরত। ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় প্রয়োজনে আরও সেনা পাঠানোর সুযোগও যুক্তরাষ্ট্রের আছে। তবে ইউরোপীয় দেশগুলোর এই উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝাতে চায় যে আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় ইউরোপেরও সমান স্বার্থ রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি। 

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS