দেশে পুরোনো বন্দোবস্তের ধারক ও বাহক কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পুনরুত্থান ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, পুরোনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষকই হলো আমলাতন্ত্র।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘আগামী সরকারের জন্য নির্বাচিত নীতি সুপারিশ ও প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ কথা বলেন। এর আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে ‘নাগরিক প্ল্যাটফর্ম’।
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম নাও হতে পারে, কারণ সরকার সংসদীয় সংস্কার, সংলাপ ও ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আগামী সরকারের জন্য ১২টি নীতি বিবৃতি ও প্রস্তাবিত জাতীয় কর্মসূচি উপস্থাপন করা হয়।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “নতুন শক্তির কথা বলে সরকার একটি ক্ষুদ্র ও উগ্র গোষ্ঠীর কাছে অনেক ক্ষেত্রে জিম্মি হয়ে গেছে। তারা নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পারেনি।তাই প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কি নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনও করতে পারবে কি না।
তিনি বলেন, পুরোনো বন্দোবস্তের ধারক ও বাহক কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর আবার উত্থান ঘটেছে।
তার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিবিদেরা আত্মগোপনে গেছেন, কিন্তু আমলাতন্ত্র দ্রুত ফিরে এসেছে। কারণ, পুরোনো বন্দোবস্তের সবচেয়ে বড় রক্ষকই হলো আমলাতন্ত্র।
এই ফিরে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ করে দিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬-২০৫০) নিয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, কোনো ধরনের আলোচনা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ বা অংশীজনদের সম্পৃক্ততা ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল প্রস্তুত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত বিব্রতকর এবং উদ্বেগজনক।
তার মতে, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে গোপনে এ ধরনের মহাপরিকল্পনা তৈরি আগের সরকারের অস্বচ্ছ চর্চাকেই পুনরাবৃত্তি করছে।
সিপিডি প্রশ্ন তুলেছে, কেন এই মহাপরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুস্পষ্ট প্রতিফলন নেই, কেন ‘রিসোর্স অপটিমাইজেশন’-এর নামে অভ্যন্তরীণ কয়লার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে এবং কেন কার্বন নির্গমনকারী জ্বালানিকে সোলারের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৫০ সালে বিদ্যুৎ চাহিদা ৬০ হাজার মেগাওয়াট ধরা হলেও সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, এর অর্ধেকের বেশি প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।
এলএনজি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ব্যয় আগের মহাপরিকল্পনার ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৭ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে উল্লেখ করে এ বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, এই ধরনের নীতিগত দলিল কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতির দলিল, যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক চাপের প্রভাব থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শিগগির জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুটি বড় অর্থনৈতিক চুক্তি হতে যাচ্ছে, যেখানে জ্বালানি বিষয়ে বড় অঙ্গীকার চাওয়া হয়েছে বলে তাদের কাছে ইঙ্গিত আছে।
সে কারণে খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে এসব চুক্তি ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে অন্য বক্তারা আরও বলেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন বলতে কেবল ভোটগণনা বা কমিশনের ভূমিকা বোঝা উচিত নয়। প্রশাসনিক কাঠামো, বিরোধী দলের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংলাপসহ সবকিছুর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতেই হবে।