পরিবেশ সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে নাগরিক সংস্কার কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
শুক্রবার (৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দুদিনের বাপা-বেন জাতীয় পরিবেশ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকারের স্বল্প মেয়াদের কারণে নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য বিষয়গুলো সংস্কারের জন্য ৬টি কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করেছে। এক্ষেত্রে পরিবেশকে উপেক্ষা করা হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়।
সরকারের সংস্কার কমিশনগুলো নাগরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে করা হয়েছিল। পরিবেশ ইস্যুতে নাগরিকদের নিয়ে এ ধরনের কমিশন গঠন করা যেতে পারে। বেসরকারি উদ্যোগে সেটা করা যেতে পারে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, নাগরিক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে।
কিন্তু পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি অগ্রাধিকার দিচ্ছে না, এই অভিযোগ সঠিক নয়। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পৃথক পরিবেশ ক্যাডার প্রবর্তনের সুপারিশ করেছে। সংবিধান সংস্কার কমিশন পরিবেশকে মৌলিক অধিকারের তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে। কিন্তু এসব সুপারিশ বর্তমান সরকারের স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সরকার যে কোনো বিষয়ে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা জবাবদিহি করতে ভয় পাই না। বরং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কিন্তু ৫৪ বছরের যে জঞ্জাল, তা পরিষ্কারের দায়িত্ব এই সরকারকে দিলে হবে? সে বিষয়ে এই সরকারের জবাবদিহি করা অসম্ভব। তবে পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা সংস্কার, নদ-নদী ও জলাশয় সুরক্ষা এবং শব্দ ও বায়ু দুষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্কের (বেন) উদ্যোগে এবং দেশের ৫৪টি পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘পরিবেশ সংক্রান্ত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং করণীয়’ শীর্ষক এ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাপা সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার।
সম্মেলনের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বাপা সহ-সভাপতি ও বেন-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. নজরুল ইসলাম।
বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ এবং বেনের বৈশ্বিক সমন্বয়কারী ড. মো. খালেকুজ্জামান প্রমুখ।
বেনের প্রতিষ্ঠাতা ও বাপা’র সহ-সভাপতি ড. নজরুল ইসলাম বলেন, এই সরকারের আমলে অনেক সংস্কার কমিশন করা হলেও পরিবেশ ইস্যুতে কোনো কমিশন হয়নি। আমরা পরিবেশ সংস্কারের বিষয়টি জুলাই সনদ এবং রাজনৈতিক দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি মনে করি।
বেনের বৈশ্বিক সমন্বয়কারী ড. খালেকুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন সময় সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে সুবিভোগীরা পরিবেশ বিনষ্ট করছে। আমরা চাই না দেশের পরিবেশ নতুন করে বিপর্যয়ের মুখে পড়ুক। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দেশের পরিবেশ সুরক্ষিত হবে না।
অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ বলেন, অনেক চেষ্টা করা হলেও পরিবেশের কোনো উন্নয়ন হয়নি। আমাদের রিসোর্স কম, কিন্তু জনসংখ্যা বেশি। পরিবেশ উন্নত করতে হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা রিসোর্স বাড়াতে হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিশেষজ্ঞ অধিবেশন শুরু হয়। এর আগে ‘রেজুলেশন অব বাপা-বেন কনফারেন্স: ২০০০-২০২৫’, ‘সাসটেনেবল আরবানাইজেশন: চ্যালেঞ্জেস এন্ড সলিউশন’ এবং ‘২৫ ইয়ারস অব বাপা: সাকসেস এন্ড চ্যালেঞ্জেস ইন এনভায়রনমেন্টাল মুভমেন্টস’ শীর্ষক তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
দুদিনের সম্মেলনে পানি উন্নয়ন, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ, নগরায়ন ও ভৌত পরিকল্পনা, যাতায়াত ও পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি, মৃত্তিকা ও খাদ্য দূষণ, বায়ু, শব্দ ও পানি দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন, পাহাড়, টিলা ও জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা এবং উপকূল, বন্দর ও সমুদ্র পরিবেশ সুরক্ষা ইস্যুতে ৭টি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
এ ছাড়া সম্মেলনে বিশ্বের ১১৭ জন বিশেষজ্ঞ পরিবেশ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। সম্মেলন শেষে সুপারিশমালা তুলে ধরা হবে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞসহ ৬ শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন এ সম্মেলনে।