নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েই নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন (গেজেট) জারি হতে পারে।সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায় থেকে এমন আভাস পাওয়ার পর নতুন পে-স্কেলের প্রত্যাশায় থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি এসেছে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের কাছ থেকে।নবম পে-স্কেলের দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির দাবিতে রোববার (২৩ আগস্ট) তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির নেতারা। তাদের আশ্বস্ত করে মুখ্যসচিব বলেন, ‘যা দেওয়া হবে, আপনারা পেয়ে খুশি হবেন।’
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের কাছে মুখ্যসচিবের এই বক্তব্য এখন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জুলাই-আগস্ট পেরিয়ে এবার সেপ্টেম্বর
নবম পে-স্কেলের গেজেট জুলাইয়ে প্রকাশের আলোচনা ছিল।পরে আগস্টের মধ্যেও প্রজ্ঞাপন জারির সম্ভাবনার কথা বলা হয়। কিন্তু বেতন বৃদ্ধির হার, বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা, জুডিসিয়াল সার্ভিসের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে পর্যালোচনার কারণে সময়সূচি পিছিয়ে যায়।
এখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বড় কোনো অনিশ্চয়তা নেই। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাব চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতিও জোরদার করা হয়েছে।
অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনায় গঠিত সচিব কমিটির আরও দুই থেকে তিনটি বৈঠক হতে পারে। এসব বৈঠকে সুপারিশগুলো যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরি করা হবে। এরপর তা যাবে মন্ত্রিসভায়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে গেজেট প্রকাশ করা হবে।
জুলাই থেকেই কার্যকর হবে?
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন গেজেট যদি সেপ্টেম্বরে হয়, তাহলে জুলাই থেকে কী হবে?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরে বকেয়া বেতন-ভাতা সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হতে পারে। অর্থাৎ গেজেট প্রকাশে কয়েক মাস দেরি হলেও কার্যকর তারিখ ১ জুলাই রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সব সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথম ধাপে সংশোধিত মূল বেতন এবং পরে বিভিন্ন ভাতা ও আর্থিক সুবিধা কার্যকর করার একটি পদ্ধতি বিবেচনায় রয়েছে।
কত হতে পারে নতুন বেতন
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। তবে সচিব কমিটি কিছু ক্ষেত্রে এই হার পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে।
প্রচারিত খসড়া অনুযায়ী, গ্রেড-১-এ মূল বেতন হতে পারে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। গ্রেড-২-এ ১ লাখ ২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রেড-৩-এ ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেতনের প্রস্তাব রয়েছে।
গ্রেড-৪-এ ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা, গ্রেড-৫-এ ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা এবং গ্রেড-৬-এ ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গ্রেড-৭-এ ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা, গ্রেড-৮-এ ৪৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭০০ টাকা এবং গ্রেড-৯-এ ৩৯ হাজার ১০০ থেকে ৯৯ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেতন হতে পারে।
গ্রেড-১০-এ ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা, গ্রেড-১১-এ ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-১২-এ ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত বেতনের প্রস্তাব রয়েছে। নিম্ন গ্রেডেও বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
গ্রেড-১৩ থেকে ২০ পর্যন্ত প্রস্তাবিত সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতন যথাক্রমে ২৪ হাজার–৫৮ হাজার, ২৩ হাজার ৫০০–৫৬ হাজার ৮০০, ২২ হাজার ৮০০–৫৫ হাজার ২০০, ২১ হাজার ৯০০–৫২ হাজার ৯০০, ২১ হাজার ৪০০–৫১ হাজার ৯০০, ২১ হাজার–৫০ হাজার ৯০০, ২০ হাজার ৫০০–৪৯ হাজার ৬০০ এবং ২০ হাজার–৪৮ হাজার ৮০০ টাকা।
‘যা দেওয়া হবে, খুশি হবেন’
পে-স্কেলের বিষয়ে মুখ্যসচিবের আশ্বাসের পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রত্যাশা আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি আবদুল মালেক বলেন, ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় রয়েছেন। এই সময়ে দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি দুটি পে-স্কেলের সমন্বয় করে সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছেন। সংগঠনের মহাসচিব আশিকুল ইসলাম পে-কমিশনের সুপারিশ করা তিনটি উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা বহাল রাখা, বেতন কাঠামোর বৈষম্য দূর করা এবং সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকার নিচে না নামানোর দাবি জানিয়েছেন। প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতেরও অনুমতি চেয়েছে।
শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে
গত ১৫ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে পর্যালোচনা কমিটির ষষ্ঠ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, অষ্টম পে-স্কেলের সীমাবদ্ধতা এবং নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখন মূল কাজ হলো অবশিষ্ট সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করা। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষ হলেই গেজেট প্রকাশ করা যাবে।
অর্থাৎ জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি পেরিয়ে আগস্টও শেষের পথে। এবার সরকারি চাকরিজীবীদের চোখ সেপ্টেম্বরের দিকে। আর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের ‘খুশি হবেন’ মন্তব্য সেই অপেক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি গেজেট প্রকাশ হবে কি না, তা নির্ভর করছে পর্যালোচনা, মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ হয় তার ওপর।