বিশ্বনেতারা কে কত ঘণ্টা ঘুমান?

বিশ্বনেতারা কে কত ঘণ্টা ঘুমান?

একটি দেশের নেতৃত্ব দেওয়া কখনোই নয়টা-পাঁচটার চাকরির মতো নয়। গভীর রাতের বৈঠক, ভোরের ব্রিফিং, জরুরি পরিস্থিতি, বিভিন্ন সময় অঞ্চলে সফর, একের পর এক সভা ও বক্তৃতা-সব মিলিয়ে বিশ্বনেতাদের দৈনন্দিন জীবন অত্যন্ত ব্যস্ত।

এত ব্যস্ততার মধ্যে তারা কতটুকু ঘুমানোর সুযোগ পান-এ প্রশ্নও কম কৌতূহলের নয়। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ঘুমের সময় নিয়ে করা এক মন্তব্যের পর বিশ্বনেতাদের ঘুমের অভ্যাস আবারও আলোচনায় এসেছে।

সানায়ে তাকাইচি: শূন্য থেকে ৩ ঘণ্টা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কম ঘুমানো নেতাদের একজন হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। জুলাইয়ে এক সরকারি ছুটির দিনে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাধারণত রাতে শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমান তিনি।

একটানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পাওয়াকে তিনি বিরল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর এই মন্তব্য জাপানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।দেশটিতে অতিরিক্ত কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ‘কারোশি’ নামে পরিচিত।

ডোনাল্ড ট্রাম্প: ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে স্বল্পঘুমের মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন।

২০১৭ সালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রায়ই রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান। সে সময় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প সাধারণত মধ্যরাত বা রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতেন এবং ভোর ৫টার দিকে আবার জেগে উঠতেন।

নরেন্দ্র মোদী: ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নিজেকে তুলনামূলকভাবে কম ঘুমানো ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

২০১৯ সালে বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে মোদি জানান, তাঁর শরীরের দৈনন্দিন ছন্দ এমন যে তিনি সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমান। এই সময়ের মধ্যেই তিনি গভীর ঘুমান বলেও উল্লেখ করেন।

ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ: ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঘুমের সময় নিয়েও অতীতে আলোচনা হয়েছে। ২০১৮ সালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তীব্র কর্মব্যস্ততার সময় ম্যাক্রোঁ রাতে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমাতেন।

তবে এই তথ্য তাঁর বর্তমান ঘুমের সময়ের পরিমাপ নয়; এটি তাঁর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের শুরুর দিকের একটি প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বলা হয়েছে।

বারাক ওবামা: প্রায় ৫ ঘণ্টা

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও রাত জেগে কাজ করার জন্য পরিচিত ছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসের ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি সাধারণত রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন।

পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার শেষ করার পরও তিনি গভীর রাত পর্যন্ত একা কাজ করতেন। ব্রিফিং নথি পড়া, লেখা এবং পরদিনের প্রস্তুতি নেওয়ার কাজে রাতের নিরিবিলি সময় ব্যবহার করতেন ওবামা।

অ্যাঞ্জেলা মার্কেল: কয়েক ঘণ্টা

জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলও দীর্ঘ সময় কাজ করার সক্ষমতার কথা বলেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে তাঁর একটি মজার তুলনা উঠে এসেছে-ঘুমের ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে উটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

মার্কেলের বক্তব্য ছিল, প্রয়োজন হলে কয়েক দিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে পারেন তিনি। তবে পরে সুযোগ পেলে সেই ঘাটতি পূরণ করে নিতেন। অর্থাৎ তিনি স্থায়ীভাবে কম ঘুমানোর দাবি করেননি; বরং ব্যস্ত সময়ে ঘুমের ঘাটতি সামলে নেওয়ার সক্ষমতার কথা বলেছিলেন।

মার্গারেট থ্যাচার: প্রায় ৪ ঘণ্টা

ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারও অল্প ঘুমানো নেতাদের তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।

১৯৮৯ সালে দ্য সানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে থ্যাচার জানিয়েছিলেন, তখন তাঁর পক্ষে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাঁর সাবেক প্রেস সচিব বার্নার্ড ইংহামও পরবর্তী সময়ে তাঁকে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন।

কম ঘুম কি সত্যিই সাফল্যের চাবিকাঠি?

বিশ্বনেতাদের কম ঘুমানোর অভ্যাস নিয়ে মানুষের আগ্রহের পেছনে একটি ধারণা কাজ করে-কম ঘুম মানেই বেশি পরিশ্রম, বেশি উৎপাদনশীলতা এবং দায়িত্বের প্রতি বেশি নিষ্ঠা। কিন্তু ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এত সরল নয়।

অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে জেনেটিক কারণে স্বাভাবিকভাবেই কম ঘুমিয়েও ভালোভাবে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে পারে। তাদের ‘ন্যাচারাল শর্ট স্লিপার’ বলা হয়। তবে এ ধরনের মানুষ ব্যতিক্রমী।

সাধারণ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না পাওয়া কোনো সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ২৪ ঘণ্টায় গড়ে সাত ঘণ্টার কম ঘুমিয়েছেন।

পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, স্মৃতি ও সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু তারা কতক্ষণ জেগে থাকতে পারেন-এমন নয়। বরং দীর্ঘ সময় না ঘুমিয়ে কাজ করার পরও তারা কতটা পরিষ্কারভাবে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বনেতাদের ঘুমের সময় নিয়ে প্রকাশিত তথ্যগুলো মূলত তাদের নিজেদের বক্তব্য অথবা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষায় মাপা তথ্য নয়। কাজের চাপ, সফর, জরুরি পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত রুটিনের কারণে একজন নেতার ঘুমের সময়ও পরিবর্তিত হতে পারে।


সূত্র: গালফ নিউজ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS