রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা শুধু অতিবৃষ্টির কারণে নয়, বরং দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীন নগর ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনার ঘাটতি ও জবাবদিহির অভাবের ফল বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নেতারা।
তারা বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কার্যকর সমন্বয় এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ঢাকার জলাবদ্ধতা অনেকাংশে নিরসন করা সম্ভব।
শনিবার (২৫ জুলাই) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) উদ্যোগে ‘বৃষ্টি নয়, সমন্বিত অব্যবস্থাপনায় ডুবছে ঢাকা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বাপার সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার নির্বাহী সদস্য ও নগরায়ন কমিটির আহ্বায়ক স্থপতি ইকবাল হাবিব।
সেমিনারে বক্তব্য দেন অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ, খুশি কবির, রুহিন হোসেন প্রিন্স, স্থপতি ড. খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, পরিকল্পনাবিদ মো. আনিছুর রহমানসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবী।
মূল প্রবন্ধে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, প্রতি বর্ষায় ঢাকায় যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, তা শুধু বৃষ্টির কারণে নয়; বরং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির ফল।পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে না পারলে এ সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, জলাবদ্ধতা শুধু ঢাকার নয়, দেশের বড় শহরগুলোরও অন্যতম সমস্যা।এ সংকট মোকাবিলায় সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।
অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, সমস্যা দেখা দিলে সাময়িক উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা ভুলে যাওয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় দেশের ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং পাম্পিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।
খুশি কবির বলেন, পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় ভুক্তভোগী মানুষ, পরিবেশবিদ, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে। খণ্ডকালীন প্রকল্পের পরিবর্তে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতের বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিবেচনায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার নকশা করতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরাট থাকায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী ড্রেনেজ ডিজাইনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বর্ষায় জলাবদ্ধতা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও দ্রুত পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাজধানীমুখী জনস্রোত কমাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
স্থপতি ড. খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক বলেন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে জলাবদ্ধতা বেড়েছে। পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
পরিকল্পনাবিদ মো. আনিছুর রহমান বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের পাশাপাশি পাম্পগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক নতুন পাম্প স্থাপন করতে হবে।
সেমিনারে বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভুক্তভোগী মানুষ, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
সেমিনার থেকে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সাত দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-
১. কঠিন ও পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং দক্ষ পেশাদারদের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালনা।
২. ভূ-প্রাকৃতিক ঢাল বিবেচনায় আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পুরো নগরকে স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনা।
৩. ডিজিটাল এলিভেশন মডেল (ডিইএম), হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে নদী, খাল, লেক, জলাভূমি ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সমন্বিত নেটওয়ার্কে আনা।
৪. নদী, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ, দখলমুক্তকরণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি মনিটরিং নিশ্চিত করা।
৫. অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের আগে ওয়াটারশেড ও ক্যাচমেন্ট এলাকা নির্ধারণ এবং পাম্পনির্ভরতা কমিয়ে নদী-খালের স্বাভাবিক সংযোগ পুনঃস্থাপন।
৬. সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতের পাশাপাশি আইইবি, আইএবি ও বিআইপির মতো পেশাজীবী সংগঠনকে যুক্ত করে অংশগ্রহণমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গঠন।
৭. জলাবদ্ধতা নিরসনকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা।
বাপার নেতারা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নই এখন সময়ের দাবি।