২০২৫ সালে হাজারো পুশ-ইন, এ বছরের মধ্য জুলাই পর্যন্ত শূন্য

২০২৫ সালে হাজারো পুশ-ইন, এ বছরের মধ্য জুলাই পর্যন্ত শূন্য

দেশের সীমান্তে আবারও বাংলাদেশি পরিচয়ে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর (পুশ-ইন) চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বিজিবির কঠোর প্রতিরোধের মুখে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পাঁচজনকে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও অবৈধ পুশ-ইন প্রতিরোধে বিজিবির সার্বক্ষণিক সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের আরেকটি উদাহরণ দেখা গেছে চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে।

গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ভোর ৪টার দিকে চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের (৬ বিজিবি) অধীন দর্শনা বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার ৭৬/৪-এস-সংলগ্ন এলাকায় বিএসএফের ৩২ ব্যাটালিয়নের গেদে ক্যাম্পের সদস্যরা নারী ও শিশুসহ পাঁচজনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করে।

বিজিবির টহলদল তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি শনাক্ত করে কঠোর অবস্থান নেয়। বিজিবির দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ শেষ পর্যন্ত ওই পাঁচজনকে নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।ফলে চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে পুশ-ইনের আরেকটি অপচেষ্টা সফলভাবে ব্যর্থ হয়। সীমান্তে বিজিবির নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ও দায়িত্বশীল অবস্থানের কারণেই এ ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিনিয়ত প্রতিহত হচ্ছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সদস্যরা সর্বদা সজাগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশি পরিচয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর ঘটনা দীর্ঘদিনের। পুশ-ইনের শিকারদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ও ভারতীয় নাগরিকও ছিল। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারি ও প্রতিরোধের কারণে চলতি বছরের মধ্য জুলাই পর্যন্ত বিএসএফ কোনো পুশ-ইন সফল করতে পারেনি।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৩৫৬ জনকে পুশ-ইন করা হয়। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৯৯৬ জন বাংলাদেশি, ২২৬ জন রোহিঙ্গা এবং ১৩৪ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।

এদের মধ্যে ২ হাজার ১৬৫ জনকে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইনের পর আটক করে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়।

অন্যদিকে, চলতি বছরের ২১ মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় পুশ-ইনের ১২০টি প্রচেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। এসব ঘটনায় প্রায় ৯৫০ জনকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের মধ্য জুলাই পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কোনো পুশ-ইন ঘটাতে পারেনি।

২০২৫ সালে কোন সীমান্তে কতজন পুশ-ইন
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৫৮০ জনকে পুশ-ইন করা হয়েছে মৌলভীবাজার সীমান্ত দিয়ে। এছাড়া সিলেট দিয়ে ২৮৯ জন, পঞ্চগড় দিয়ে ১৯৬ জন, খাগড়াছড়ি দিয়ে ১৫৩ জন, লালমনিরহাট দিয়ে ১৫০ জন, মেহেরপুর দিয়ে ১১৬ জন, ঠাকুরগাঁও দিয়ে ১০২ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে ৯২ জন, কুড়িগ্রাম দিয়ে ৯১ জন, নেত্রকোনা দিয়ে ৭৬ জন, সুনামগঞ্জ দিয়ে ৭৪ জন এবং ফেনী সীমান্ত দিয়ে ৬৯ জনকে পুশ-ইন করা হয়।

এছাড়া চুয়াডাঙ্গা দিয়ে ৬২ জন, দিনাজপুর দিয়ে ৫২ জন, নওগাঁ দিয়ে ৪৬ জন, হবিগঞ্জ দিয়ে ৪১ জন, ময়মনসিংহ দিয়ে ৩৩ জন, সাতক্ষীরা দিয়ে ৩২ জন, শেরপুর দিয়ে ৩১ জন, ঝিনাইদহ দিয়ে ২৬ জন, কুমিল্লা দিয়ে ১৩ জন, কুষ্টিয়া দিয়ে ৯ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া দিয়ে ৭ জন এবং জয়পুরহাট দিয়ে ৪ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হয়।

সীমান্ত সম্মেলনে গুরুত্ব পায় পুশ-ইন ইস্যু
চলতি বছরের জুন মাসে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে চার দিনব্যাপী ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তবে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সীমান্ত বৈঠকের ইতিহাসে এবারই প্রথম একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে।

বৈঠক শেষে যৌথ আলোচনার নথিতে উভয়পক্ষ স্বাক্ষর করলেও, প্রথা অনুযায়ী দুই বাহিনীর মহাপরিচালক কোনো যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশে নতুন সরকার এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজ্য সরকার গঠনের পর এটি ছিল দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানদের প্রথম বৈঠক। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে দুই দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেয়।

বৈঠকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সীমান্তে বিএসএফের কথিত ‘পুশ-ইন’ বা লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর বিষয়টি। বাংলাদেশ এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক প্রটোকলের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে তীব্র আপত্তি জানায়। অন্যদিকে ভারত দাবি করে, তাদের পদক্ষেপ আইনসম্মত এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধেই তা পরিচালিত হচ্ছে।

সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ কর্মসূচি সীমান্ত ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে বাড়তি সংবেদনশীলতা তৈরি করেছে। তবে যৌথ সংবাদ সম্মেলন না হলেও উভয়পক্ষ সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের পরবর্তী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

পুশ-ইন অবৈধ ও মানবাধিকার পরিপন্থী
সীমান্তে বেআইনিভাবে বা জোরপূর্বক অন্য দেশের নাগরিকদের নিজ ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়াকে পুশ-ইন বলা হয়। অর্থাৎ, একটি দেশ যখন তার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে কোনো বিদেশি নাগরিক বা নিজ দেশের নাগরিককে আটক করে গোপনে বা জোরপূর্বক প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে ঠেলে দেয় বা প্রবেশ করায়, তখন তাকে পুশ-ইন বলা হয়।

অবৈধভাবে বা জোরপূর্বক কাউকে সীমান্ত পার করা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সরকারের অবস্থান হলো, বৈধ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

পুশ-ইনের শিকার বিভিন্ন নাগরিক ও গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।

বাংলাদেশি নাগরিক: পুশ-ইন করা ব্যক্তি বাংলাদেশি কি না, তা নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জাতীয়তা যাচাই করা হয়। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রমাণিত হলে তাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশের দায়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা বা অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ভারতীয় নাগরিক: কোনো ভারতীয় নাগরিক অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে বা পুশ-ইনের শিকার হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত চুক্তি এবং বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ: একতরফাভাবে কোনো দেশের নাগরিককে নো-ম্যানস ল্যান্ড বা সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়া হলে বাংলাদেশ তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির সুরাহার উদ্যোগ নেয়।

রোহিঙ্গা নাগরিক: মানবিক আশ্রয় ও নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের শুধুমাত্র মানবিক কারণে কঠোর ব্যবস্থাপনার আওতায় নিজ ভূখণ্ডে আশ্রয় দিয়েছে।

অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে ভারতে চলে যাওয়া বা ভারত থেকে পুশ-ইনের মাধ্যমে ফেরত আসা রোহিঙ্গারা পুনরায় অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত সীমান্ত আইন ও পাসপোর্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নানা কারণে উত্তেজনা ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এ সময় ভারত সীমান্ত দিয়ে বাংলাভাষী মানুষদের বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা বাড়ায়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর তীব্র আপত্তির কারণে প্রায়ই বিএসএফের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনার ঘটনাও ঘটে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS