ব্ল্যাকআউট না ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’: ইরানের ইন্টারনেট বাস্তবতা

ব্ল্যাকআউট না ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’: ইরানের ইন্টারনেট বাস্তবতা

ইন্টারনেট বন্ধ—এই শব্দযুগল সাধারণত একটি স্পষ্ট চিত্র তৈরি করে: অন্ধকার স্ক্রিন, বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ, থেমে যাওয়া ডিজিটাল জীবন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বাস্তবতা এত সরল নয়।এখানে ইন্টারনেট একেবারে ‘বন্ধ’ নয়, আবার পুরোপুরি ‘চালু’ও নয়। বরং একটি জটিল, নিয়ন্ত্রিত এবং ধাপে ধাপে বিভক্ত ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে কারও জন্য সংযোগ সীমিত, কারও জন্য শর্তসাপেক্ষ, আর কারও জন্য প্রায় স্বাভাবিক।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সংযোগে বিধিনিষেধ আরোপের পর এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বৈশ্বিক ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আজ (২৫ এপ্রিল) পর্যন্ত ঠিক আট সপ্তাহ কেটে গেছে।সেই দিন ইরানে সরকারি নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই বন্ধ হয়ে এখন ৫৭ দিন (১৩৪৪ ঘণ্টা) পার হয়ে গেছে।এর ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের কথা বলার জায়গাটি বন্ধ হয়ে গেছে, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, আর দেশের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।’

নেটব্লকস কিংবা অন্যান্য ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইরানে ইন্টারনেট বলতে কেবল আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটব্যবস্থাকেই বোঝায়। তারা বাইরে থেকে যেটিকে ব্ল্যাকআউট হিসেবে দেখছে, ভেতরে সেটি কাজ করছে ভিন্ন এক কাঠামোয়—যেখানে ইন্টারনেট কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির একটি কৌশলগত হাতিয়ার। পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যমে ১ এপ্রিল থেকে ইরান সম্পূর্ণ অফলাইন—এমন দাবি করা হলেও বাস্তবে দেখা যায়, দেশটি একটি নিয়ন্ত্রিত ও স্তরভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছে।

ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা
২০১৭ সালের ডিসেম্বরের বিক্ষোভ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ একটি ধারাবাহিক নীতিতে পরিণত হয়েছে। সে সময় প্রথম বড় পরিসরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সীমিত করা হয়, বিশেষ করে টেলিগ্রাম ও ইনস্টাগ্রাম সাময়িকভাবে বন্ধ এবং ইন্টারনেটের গতি ও অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এরপর ২০১৯ সালের নভেম্বরের জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি-ঘিরে বিক্ষোভের সময় দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট আরোপ করা হয়, যা কয়েকদিন স্থায়ী ছিল এবং সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে কঠোর ডিজিটাল অবরোধ হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালে পুলিশি হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সময় আবারও ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল-মার্কিন আগ্রাসনের সময় ইরানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট প্রবেশে সীমাবদ্ধতা ও আংশিক বিচ্ছিন্নতা দেখা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পশ্চিমা মদদে দাঙ্গার সময়ও আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট কিছু দিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করা হয়।

Iran


আংশিক বিচ্ছিন্নতা, পূর্ণ অচলাবস্থা নয়
বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধারা বজায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ও প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ অনেক ক্ষেত্রে ধীর বা সীমিত হলেও দেশের ভেতরের ডিজিটাল কার্যক্রম থেমে নেই। ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, পরিবহন সেবা, এমনকি শিক্ষা কার্যক্রমও সচল রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলের অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা চলছে, সরকারি সেবা বন্ধ হয়নি। অর্থাৎ, অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক সচল রেখে আন্তর্জাতিক সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—যা ‘ব্ল্যাকআউট’ ধারণা থেকে ভিন্ন একটি বাস্তবতা তুলে ধরে।

জাতীয় ইন্টারনেট: ভেতরের কাঠামোর শক্তি
এই বাস্তবতার পেছনে রয়েছে ইরানের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্ক। এর লক্ষ্য—দেশীয় ডাটা দেশের ভেতরে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোকে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে আংশিক মুক্ত করা। ফলে আন্তর্জাতিক সংযোগ সীমিত হলেও দেশীয় ওয়েবসাইট ও অ্যাপ সচল থাকে, ব্যাংকিং ও ই-কমার্স চালু থাকে এবং সরকারি তথ্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকে। এই কাঠামো ইরানকে ‘পূর্ণ ব্ল্যাকআউট’ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুযোগ দেয়।

নির্বাচিত সংযোগ ও ‘ইন্টারনেট প্রো’
ইরানের ইন্টারনেট ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্বাচিত প্রবেশাধিকার। আগে অনানুষ্ঠানিকভাবে যাকে ‘হোয়াইট লাইন’ বলা হতো, এখন সেটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রীপরিষদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কমান্ডার, কিছু সাংবাদিক এবং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের বিশেষ অনুমতি পান। আবেদন, যাচাই ও অনুমোদনের মাধ্যমে এই অ্যাক্সেস দেওয়া হয়। এই কাঠামোকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে ‘ইন্টারনেট প্রো’ সেবা। বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এটি মূলত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সীমিত। ফলে একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—একদিকে সীমাবদ্ধ সাধারণ ব্যবহারকারী, অন্যদিকে অনুমোদিত সংযোগপ্রাপ্ত একটি শ্রেণি।

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ব্যবহার
ইরানে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম সীমিত হলেও ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং এক্স প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীরা এখনও সক্রিয়। অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহারকারীরা ভিপিএনের ওপর নির্ভর করেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা ও ব্যবহার—দুই বাস্তবতা একসঙ্গে চলতে থাকে।

ভিপিএন থেকে প্রিমিয়াম ইন্টারনেট: ধারাবাহিকতা
আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটে সরাসরি প্রবেশ সীমিত হওয়ার পর ফিল্টারিং এড়াতে ব্যবহৃত টুলের চাহিদা দ্রুত বেড়ে যায়। এর ফলে ভিপিএন বিক্রেতাদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যারা এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হয়। কম স্বচ্ছতার এই পরিবেশে, কিছু বিক্রেতা এমন ডেটা সেন্টারের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে সেবা দিতে সক্ষম হয় যাদের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটে তুলনামূলক বেশি প্রবেশাধিকার ছিল। এর ফলে একটি বহুস্তরীয়, অস্বচ্ছ বাজার তৈরি হয়। এখন আন্তর্জাতিক অ্যাক্সেস সীমিত হওয়ায় ‘প্রিমিয়াম ইন্টারনেট’ মডেল সামনে আসছে। অর্থাৎ: নিয়ন্ত্রণ → বিকল্প বাজার → নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো।
 

Iran
 আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সীমিত, তবে জাতীয় নেটওয়ার্কে ব্যাংকিং, শিক্ষা ও সরকারি সেবাসহ সব কাজ চলছে


দেশীয় অ্যাপের উত্থান
আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম সীমিত থাকায় দেশীয় অ্যাপের ব্যবহার বেড়েছে। যেমন বালে (Bale), রুবিকা (Rubika), ইটা (Eitaa) এবং সোরুশ (Soroush)—এসব অ্যাপকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এসব অ্যাপে মেসেজিং, ভয়েস কল, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক সেবাও রয়েছে। বর্তমানে Bale অ্যাপটি পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই ব্যবহার করা যাচ্ছে। তবে যার টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট আছে তিনিই কেবল এটি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।

ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার কারণ
ইরান সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার মূল যুক্তি নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা। তাদের মতে, সংকটময় সময়ে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্য দ্রুত বাইরে চলে যেতে পারে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে সাইবার হামলা, অবকাঠামোতে হ্যাকিং, ভুয়া তথ্য ও সমন্বিত প্রচারণা—এসবকেও তারা বাস্তব হুমকি হিসেবে দেখে। তাই আন্তর্জাতিক সংযোগ সাময়িকভাবে সীমিত করে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, গুরুত্বপূর্ণ ডাটা সুরক্ষা এবং সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমনটাই সরকারি যুক্তি। পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দ্রুত সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের কথাও উল্লেখ করা হয়। সরকারের ভাষ্যে, এই ধরনের পদক্ষেপ স্থায়ী নয়; বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া হয়, যাতে দেশের ভেতরের স্থিতিশীলতা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সচল রাখা যায়।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: স্বতন্ত্র ইরানি মডেল
ইরান একা নয়; চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোও নিজস্ব ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে। তবে ইরান কারোর সরাসরি অনুসারী নয়, বরং একটি তৃতীয় পথ তৈরি করেছে। চীনের মতো স্থায়ী ও শক্তিশালী ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’ ইরানের নেই, আবার রাশিয়ার তুলনামূলক নমনীয় নিয়ন্ত্রণও তাদের পদ্ধতি নয়। ইরানের পন্থা অধিক পরিস্থিতিগত ও স্তরভিত্তিক—সংকটের সময় আন্তর্জাতিক সংযোগ সীমিত করে, ভেতরের নেটওয়ার্ক সচল রেখে ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’ প্রয়োগ করে। চীন ও রাশিয়া যেমন ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের’ কথা বলে, ইরানও তাই করে, কিন্তু বাস্তবায়নের কৌশল ও কঠোরতায় এটি স্বতন্ত্র। একে অনেক বিশ্লেষক ‘ইরানের স্টেল্থ ব্ল্যাকআউট মডেল’ হিসেবে অভিহিত করছেন, যা ভূ-রাজনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের মিশেলে তৈরি।

ইন্টারনেটে ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’-এর ভবিষ্যৎ
ইরানের ইন্টারনেট ব্যবস্থা আজ ঐতিহ্যবাহী ‘ব্ল্যাকআউট’ ধারণাকে অতিক্রম করে একটি নতুন বাস্তবতা নির্মাণ করেছে। এখানে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ হয় না; বরং ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’-এর মাধ্যমে একে ধাপে ধাপে, স্তরে স্তরে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিচালনা করা হয়। জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্ক, নির্বাচিত সংযোগপ্রাপ্ত শ্রেণি (‘ইন্টারনেট প্রো’), দেশীয় অ্যাপের উত্থান এবং ভিপিএননির্ভর প্রিমিয়াম বাজার—সব মিলিয়ে এটি একটি জটিল ইকোসিস্টেম, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার একসঙ্গে সহাবস্থান করে।

ইরান চীন বা রাশিয়ার পথের প্রতিলিপি তৈরি করেনি; বরং নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক চাপ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের ভিত্তিতে গড়ে তুলেছে একটি স্বতন্ত্র মডেল। এই মডেলের মূল সাফল্য হলো—আন্তর্জাতিক সংযোগ সীমিত রাখলেও দেশের অত্যাবশ্যকীয় ডিজিটাল সেবা চালু রাখা। ভবিষ্যতে এই ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’ আরও পরিশীলিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS