ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা শুরুর প্রায় আট সপ্তাহ পর, হোয়াইট হাউস তার কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে। শুরুতে ‘শক অ্যান্ড অ’ (বিস্ময়-ভীতির কৌশল) ধাঁচের ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও নেতৃত্বকে অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এখন তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের দিকে ঝুঁকেছে—এমন এক শাসনের বিরুদ্ধে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় অভ্যস্ত।
আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ার পর হোয়াইট হাউস তাদের বার্তাও পরিবর্তন করেছে। এখন তারা বলছে, ইরানের সঙ্গে একটি টেকসই চুক্তির জন্য তারা অপেক্ষা করতেও প্রস্তুত।যদিও হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা এতটাই কার্যকর ছিল যে তা ইরানের নেতৃত্বকে বিভক্ত করে দিয়েছে এবং নতুন করে ক্ষমতার সংহতি গড়ে ওঠা ঠেকিয়েছে।
তিনি কতদিন অপেক্ষা করতে রাজি, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাকে তাড়াহুড়া করিয়ো না’। তিনি বলেন, ‘আমরা ভিয়েতনামে প্রায় ১৮ বছর ছিলাম।ইরাকে বহু বছর ছিলাম… আমি তো মাত্র ছয় সপ্তাহ ধরে এটা করছি।’
তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলে যে তিনি আগে বলেছিলেন যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহে শেষ হবে। ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি আশা করেছিলাম, কিন্তু একটু বিরতি নিয়েছি।’
ট্রাম্পের কূটনৈতিক অবস্থানের এই হঠাৎ পরিবর্তন এবং যুদ্ধের বাড়তে থাকা খরচ পেন্টাগন ও পররাষ্ট্র দপ্তরের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কংগ্রেসের উভয় দলের আইনপ্রণেতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের এক বৈঠকে নতুন কৌশল নির্ধারণ হয়, যেখানে ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন। পরিকল্পনা হলো: ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখা, যাতে তারা হরমুজ প্রণালী খুলে দেয় এবং একই সঙ্গে তেহরানের কাছ থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে একটি সমন্বিত জবাবের জন্য অপেক্ষা করা।
কিন্তু ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য কোনো সুসংহত কৌশল না থাকা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী খোলার বিষয়ে মার্কিন মিত্রদের বিশ্বাস করিয়েছে যে হোয়াইট হাউস কার্যত সমাধানের পথ হারাচ্ছে।
ওয়াশিংটনে এক জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা কোনো পরিষ্কার কৌশল দেখছি না এবং আমাদের মনে হয় আসলে কোনো কৌশল নেই। আর আমরা আশঙ্কা করছি, এর পরিণতি আমাদেরই সামলাতে হবে।’
এদিকে ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিচ্ছে, যারা প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছে না, সেই ন্যাটো মিত্রদের শাস্তি দেওয়া হতে পারে। যদিও হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি তারাই বহন করছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘আমরা ইউরোপের ওপর নির্ভর করছি না, কিন্তু তাদেরই হরমুজ প্রণালী বেশি দরকার। তাই শুধু কথা বলা বা ইউরোপে সম্মেলন করার বদলে, নৌকায় ওঠা উচিত।’
তেলের বাজার আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল থাকলেও এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত জ্বালানি সংকট ছড়িয়ে পড়ছে। জেট জ্বালানির ঘাটতির কারণে বিমান সংস্থাগুলো হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল করতে শুরু করেছে। সাবেক আলোচকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা ইরানের জন্য একটি শক্তিশালী দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যা নতুন কোনো চুক্তি করা কঠিন করে তুলবে।
নভেম্বরে কঠিন মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানরা চাপের মুখে আছে। বাজার ও জ্বালানির দাম স্থিতিশীল করতে এবং হরমুজ প্রণালী খুলতে প্রশাসনের ওপর সময়ের চাপ বাড়ছে।
তবুও, অঞ্চলে তৃতীয় মার্কিন বিমানবাহী রণতরী পাঠানোসহ সামরিক উপস্থিতি বাড়লেও হোয়াইট হাউস এখনো সামরিক সমাধানের পথে যেতে দ্বিধাগ্রস্ত।
তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করতে নৌবাহিনীর পাহারা দিতে পারে, যা ১৯৮০-এর দশকের ‘অপারেশন আর্নেস্ট উইল’ অভিযানের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সে সময় ইরান-ইরাক যুদ্ধের ‘ট্যাঙ্কার যুদ্ধ’ পর্যায়ে কুয়েতি তেলবাহী জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু তখন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধের পক্ষ ছিল না, যা এখনকার পরিস্থিতিতে ভিন্ন। তাছাড়া ওই অভিযানের সময় প্রায় ৪৫০টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৪০০-এর বেশি বেসামরিক লোক ও বহু মার্কিন নাবিক নিহত হন।
ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের গবেষক এমা অ্যাশফোর্ড বলেন, ‘আমরা আগে এটা করেছি। পুরো বিষয়টি খুব ব্যয়বহুল ছিল। এতে তেল চলাচল বজায় ছিল, কিন্তু আজকের দিনে সেই ঝুঁকি নেওয়ার মতো আগ্রহ আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
এদিকে অঞ্চলে ড্রোন হামলার বাড়তি ঝুঁকিও দেখা দিয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুদ কমিয়ে দিচ্ছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ইতোমধ্যে ব্যবহার করে ফেলেছে, যেগুলোর প্রতিটির দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনটি বলছে, ‘অস্ত্রের মজুদ কমে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। চীনের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ হলে আরও বেশি হারে অস্ত্র ব্যবহার হবে। যুদ্ধ-পূর্ব মজুদই যথেষ্ট ছিল না, বর্তমান অবস্থা ভবিষ্যৎ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা সীমিত করতে পারে।’