খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘ইচ্ছাকৃত গাফিলতি’র অভিযোগ ডা. সিদ্দিকীর

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ‘ইচ্ছাকৃত গাফিলতি’র অভিযোগ ডা. সিদ্দিকীর

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কারাবন্দি থাকাকালে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় চরম অবহেলা ও ইচ্ছাকৃত গাফিলতির অভিযোগ করেছেন তার চিকিৎসা দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়াকে এমন ওষুধ দেওয়া হয়েছে যা ‘স্লো পয়জন’র মতো কাজ করেছে।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ডা. এফ এম সিদ্দিকী এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি ওষুধ তার লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জনের’ মতো কাজ করেছে, যা শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, অনেকেই প্রশ্ন করেন, ম্যাডামকে কি স্লো পয়জন করা হয়েছে? আমার উত্তর হচ্ছে, ‘মেথোট্রেক্সেট’ ছিল সেই ওষুধ, যা তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে এটি তার লিভারের জন্য ধীরে ধীরে বিষের মতো কাজ করেছে।

তিনি আরও বলেন, আজ দেশের লক্ষ-কোটি মানুষের বুকের ভেতরে গভীর এক আফসোস কাজ করছে। সারাজীবন গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকার করা মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন! যদি দেখতে পেতেন মানুষ নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে!

বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. সিদ্দি্কী বলেন, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আমরা, বর্তমান মেডিকেল বোর্ড, তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করি।ভর্তি হওয়ার পরপরই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা বিস্ময় ও গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখতে পাই যে ম্যাডাম লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত।

তিনি জানান, এর আগের চিকিৎসা ছাড়পত্র অনুযায়ী রিউমাটয়েড আর্থাইটিসের জন্য তাকে নিয়মিত ‘মেথোট্রেক্সেট’ নামের ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছিল, যা হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেও চালু রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে এই ওষুধ বন্ধ করে দিই।

ডা. সিদ্দিকী আরও জানান, বেগম খালেদা জিয়া একই সঙ্গে ফ্যাটি লিভার ডিজিজেও আক্রান্ত ছিলেন।

এমন অবস্থায় নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট করা এবং প্রয়োজন হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা ছিল অত্যাবশ্যক।

তিনি বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ আসার পরও সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি, এমনকি মেথোট্রেক্সেটও বন্ধ করেনি।

তিনি বলেন, তৎকালীন চিকিৎসকদের ওপর আস্থার অভাবে বেগম খালেদা জিয়া সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করতে রাজি হননি। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তার আস্থাভাজন চিকিৎসক দিয়ে বেডসাইডে ‘পয়েন্ট অব কেয়ার আল্ট্রাসাউন্ড’ করা যেত, অথবা অন্তত মেথোট্রেক্সেট বন্ধ করা ছিল ন্যূনতম দায়িত্ব।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দি্কী অভিযোগ করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এ ধরনের অবহেলা, লিভার ফাংশনের দ্রুত অবনতি তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।এটি ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এটি তাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ডায়াবেটিস ও আর্থাইটিসের চিকিৎসায়ও অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে রয়েছে।

এ ঘটনায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে আইনগত তদন্তের দাবি জানিয়ে অধ্যাপক ডা. সিদ্দিকী তিনটি বিষয় উল্লেখ করেন– সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা কারা ছিলেন এবং কী যোগ্যতায় তারা চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন; চিকিৎসাকালে কোন কোন চিকিৎসক সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং সেখানে অবহেলার প্রমাণ আছে কিনা; এবং বেগম খালেদা জিয়া কেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের চিকিৎসা দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেননি বা কারা এতে বাধা দিয়েছিল।

সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নথি আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

ডা. সিদ্দিকী বলেন, আমরা আশা করি, সরকার ম্যাডামের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবে। আমরা জানি, ন্যায়বিচারে বিলম্ব মানেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS