শোকসভায় খালেদা জিয়ার ত্যাগ-সংযম-দৃঢ়তাকে স্মরণ

শোকসভায় খালেদা জিয়ার ত্যাগ-সংযম-দৃঢ়তাকে স্মরণ

বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে নাগরিক শোকসভায় তার ত্যাগ, সংযম, উদারতা ও দৃঢ়তাপূর্ণ নেতৃত্বকে স্মরণ করেছেন বক্তারা।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এই শোকসভার আয়োজন করা হয়। সভা শুরু হয় বিশ্বজয়ী হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিকের কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর শোকগাঁথা পাঠ করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সালেহ উদ্দিন।

শোকসভার আহ্বায়ক ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্ল্যাহ এবং সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি জে. আর. মোদাচ্ছির হোসেন।

আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে ছিলেন খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার পরিবারের সদস্য, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট নাগরিকরা।

শোকসভায় বক্তারা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, দেশ-জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য তার ত্যাগ, ব্যক্তিগত সংযম এবং তার প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলার নানা দিক তুলে ধরেন।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও যায়যায়দিন পত্রিকার সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন, উনি থাকবেন।আমরা একটি সংকটকালীন মুহূর্তে আছি। যেকোনোভাবেই হোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন যেন হয়। আমি সেটা চাই। ভোটকেন্দ্রে সবাইকে যেতে হবে উৎসবমুখরভাবে।

ভোটের পরিবেশ যেন বিঘ্নিত না হয়। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। বেগম খালেদা জিয়াকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে।’

নিউ এইজের সম্পাদক নূরুল কবীর জানান, বেগম খালেদা জিয়া শুধু জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী ছিলেন না, সত্যিকার অর্থেই মানুষের এবং দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন।

‘তার মৃত্যুর মাধ্যমে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের দল-মত নির্বিশেষে জানাজায় অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে’, বলেন নূরুল কবীর।

এই সাংবাদিক বলেন, ‘মানুষ হিসেবে বরাবর তার যেই গুণটি আমাকে আকৃষ্ট করেছে, রাজনীতিতে যখন রুচি, শালীনতা এবং পরিমিতিবোধের এক খরা চলছিল বহু বছর ধরে, সে সময় আমি লক্ষ্য করেছি নিরন্তরভাবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে তার যেমন সাফল্য ছিল, সে সাফল্য মোকাবিলা করতে গিয়ে তার ওপর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যে আঘাত দিয়েছেন, তার পরিবারের ওপর যে দুর্ভোগ গিয়েছে, এর জন্য কখনোই তিনি প্রকাশ্যে তার বেদনাবোধ বা ক্ষোভের কথা উচ্চারণ করেননি। এই যে সংযম, পরিমিতবোধ এবং আত্মমর্যাদা, রাজনীতিতে অনেক অনুসারী থাকবেন, অনেক মত-দর্শন থাকবেই; যিনি রাজনীতিবিদ, যেই সংস্কারেরই অনুসারী হোন না কেন, আজকের বাংলাদেশের অসহিষ্ণু সময়ে এই সংযম-পরিমিতিবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। এটা তাকে আজীবন ইতিহাসে অনন্যতার সঙ্গে স্মরণ রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।’

খালেদা জিয়া স্বাধীন সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতেন জানিয়ে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমি স্বাধীন সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করি। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে তার সঙ্গে একাধিকবার দেখা করেছি। তিনি উৎসাহিত করতেন। গণতন্ত্রে তার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। বিগত সরকার তাকে নানাভাবে নির্যাতন করেছে। এতকিছু করার পরও ৭ আগস্ট তিনি আমাদের যে বাণী দিয়েছেন তা তার উদারতার পরিচয় বহন করে। তিনি বলেছেন, ধবংস নয়। ভবিষ্যতের ভালোবাসা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কথা বলেছেন। খালেদা জিয়ার এই বাণীকে যেন আমরা লালন করি।’

খালেদা জিয়ার সময়টাকে তিনটি দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে উল্লেখ করে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এক কঠিন মুহূর্তে তার রাজনৈতিক উত্থান পর্ব। তখন তিনি ছিলেন আপসহীন। সরকার গঠন। এই সময়ে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা আছে। আর ২০০৭ সাল থেকে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় দিতে হবে তিনি নিরপেক্ষ পদ্ধতিতে নির্বাচনে প্রথম প্রধানমন্ত্রী।’

বেগম খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশে গত ১০০ বছরে পাঁচ জন এমন নেতা এসেছিলেন যারা জীবনের কোনো সময় জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন, তাদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ আমলে, দুজন পাকিস্তান আমলে এবং দুজন স্বাধীন বাংলাদেশে। ব্রিটিশ আমলে এসছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক। পাকিস্তান আমলে মওলানা ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশে আমলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই পাঁচজনের মধ্যে মওলানা ভাসানী কখনো ক্ষমতায় যাননি, বাকি চারজন ক্ষমতায় গেছেন। এই চারজনের মধ্যে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের রাজনীতিতে উত্থান-পতন আছে। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনেও উত্থান-পতন আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো শহীদ প্রেসিডেন্ট এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১০০ বছরের ইতিহাসে দুই নেতা এবং নেত্রী, যারা জনপ্রিয়তার শীর্ষে সারা জীবন অবস্থান করেছেন। এটা আমাদের স্মরণে রাখা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি সারা পৃথিবীর ইতিহাস পড়ার চেষ্টা করি। যতটুকু পড়েছি, একই বাড়ি থেকে, একই সংসার থেকে, স্বামী এবং স্ত্রী পুরো জাতির সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন পুরো রাজনৈতিক জীবন ধরে। যেই জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন, সে জনপ্রিয়তা নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন। এ রকম বিষয় সারা পৃথিবীতে নাই।’

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ইচ্ছেকৃত অবহেলার অভিযোগ করে তার চিকিৎসক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, “অনেকেই প্রশ্ন করেন, ম্যাডামকে কি স্লো পয়জন করা হয়েছে? আমার উত্তর হচ্ছে, ‘মেথোট্রেক্সেট’ ছিল সেই ওষুধ, যা তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে এটি তার লিভারের জন্য ধীরে ধীরে বিষের মতো কাজ করেছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, “বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় এই ধরনের অবহেলা, লিভার ফাংশনের দ্রুত অবনতি তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটি ‘উইলফুল নেগলিজেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এটি তাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।”

লেখক ও চিন্তক ফাহাম আব্দুস সালাম বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার জীবনের পুরোটাই স্যাক্রিফাইস। অল্প বয়সে উনি স্বামী হারিয়েছেন, সন্তান হারিয়েছেন। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। অসহনীয় অত্যাচারের মধ্যে দিয়ে গেছেন। শেষ অত্যাচারটা ছিল ওনাকে বিনা চিকিৎসায় আওয়ামী লীগের একটি ফ্যাসিস্ট রেজিম তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আমি মনে করি, বিএনপির অনেক নেতা অনেক স্যাক্রিফাইস করেছেন, কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার ত্যাগ ছিল সব থেকে বেশি। এই জায়গায়টায় উনি অনন্য।’

বিশ্বের গণতান্ত্রিক ইতিহাস বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া অসম্পূর্ণ মন্তব্য করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসু দেব ধর বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রামে, বাংলাদেশের অধিকারের সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়াকে রাস্তায় দেখেছি। যে মৃত্যু মানুষকে মৃত্যুঞ্জয়ী এবং আরও প্রতিবাদী হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়, তারা ইতিহাসে স্থান করে নেন, বেগম খালেদা জিয়া এমনই। আজকে আমরা এক নতুন পরিস্থিতিতে, আমি একটা কথা শুধু নিবেদন করতে চাই- এবারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগটা যেন আমরা হাতছাড়া না করি। এটাই হবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মাননা। বাংলাদেশের একটি নাগরিকও যদি ধর্ম বা অন্য কোনো কারণে নিগৃহীত না হয়, এই নতুন গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যমে যদি তা নিশ্চিত হয়, আমি মনে করি, সেটাই হবে মরহুমার প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন।”

শোকসভা আয়োজনের আহ্বায়ক ড. মাহবুব উল্ল্যাহ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে বলেন, ‘মানুষ খালেদা জিয়াকে অনন্তকাল স্মরণ করবে। কারণ, দেশের জন্য তার ত্যাগ ও নিষ্ঠা অপরিসীম। তিনি এদেশের মানুষ, গাছ, লতাপাতা ও পানি ভালোবাসতেন। বলতেন, দেশের বাইরে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলেও তার আদর্শ চির অম্লান হোক। আল্লাহ আমাদের নেত্রীকে বেহেশত দান করুন।’

শোকসভার সভাপতির বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির বলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম খালেদা জিয়া। তিনি সাধারণ রাজনীতিবিদ ছিলেন না। ছিলেন রাজনৈতিক আদর্শ। ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অসাধারণ দৃঢ়চেতা। কঠিন সময়েও চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ধ্বংস নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমার বিবেচনায় তিনি বিচক্ষণ। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়াকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক উপাধি দেওয়ার দাবি জানাই।’

শোকসভায় আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রাশেদ আল তিতুমীর, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, আইসিসিবির সভাপতি মাহবুবুর রহমান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাংবাদিক আশরাফ কায়সার ও কাজী জেসিন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023 EU BANGLA NEWS