বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাস ও দাঙ্গার বিরুদ্ধে রাজধানী তেহরানসহ গোটা ইরানে লাখ লাখ মানুষের মহাসমাবেশ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ও প্রতিরোধের বার্তা দেওয়া হয়েছে। সব প্রদেশের মানুষ রাস্তায় নেমে একযোগে ঘোষণা করেন—আমরা ঐক্যবদ্ধ, আমরা ভয় পাই না।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় বেলা ২টা থেকে ‘মার্কিন–ইসরায়েলি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় সংহতি সমাবেশ’ নামে এই বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হয়। কিছু প্রদেশে সকাল থেকেই মানুষের ঢল নামে।
সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যেই প্রধান সড়কগুলো কানায় কানায় ভরে ওঠে।
রাজধানী তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ার ও আশপাশের সড়কগুলো দুপুরের আগেই জনসমুদ্রে পরিণত হয়। প্রতিবাদকারীরা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে স্লোগান দেন— ‘দেশদ্রোহীরা ধ্বংস হোক’, ‘ইসরায়েলি ষড়যন্ত্রকারীদের পতন হোক’, ‘আমরা সর্বোচ্চ নেতার প্রতি অনুগত’—এমন স্লোগানে প্রতিধ্বনিত হয় পুরো শহর।
সমাবেশস্থলে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়িও প্রদর্শন করা হয়েছে, যেটি সাম্প্রতিক দাঙ্গায় দুষ্কৃতকারীরা পুড়িয়ে দিয়েছিল—যা এখন মানুষের কাছে ‘সহিংস নৃশংসতার প্রতীক’ হিসেবে প্রদর্শিত হচ্ছে।

মানুষের হাতে ছিল সেই নিরাপত্তারক্ষী শহীদদের ছবি, যারা সাম্প্রতিক দাঙ্গায় জীবন দিয়েছেন। শহীদদের স্মরণে অনেকেই অশ্রুসিক্ত চোখে জাতীয় পতাকা নাড়েন এবং সরকারের প্রতি শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সমর্থন জানান।
রাজধানীর ইনকিলাব স্কয়ারে আয়োজিত কেন্দ্রীয় সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেয়ি, প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি। নেতারা জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মার্কিন–ইসরায়েলি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান।

তেহরানের বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
ঐক্যের জোয়ার সারা দেশে
বুশেহর, খোরাসান রাজাভি, পশ্চিম আজারবাইজান, ইসফাহান, চাহারমাহাল ও বাখতিয়ারি, গিলান, দক্ষিণ খোরাসান, সিস্তান ও বালুচিস্তান, বন্দর আব্বাস, কুর্দিস্তান, কেন্দ্রীয় প্রদেশ, কাশান এবং কেশম দ্বীপসহ প্রায় সব অঞ্চলে রাজপথে জনতার ঢল নামে। সকাল থেকেই স্লোগানে মুখর ছিল রাজপথ—‘আমরা শহীদদের দেখানো পথেই আছি’, ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ মানব না’।
অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে বিদেশি উসকানির হাত
গত মাসে কিছু ব্যবসায়ী ও নাগরিক দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মন্তব্য ও বিদেশি ফারসি ভাষার সম্প্রচারমাধ্যমে উসকানিমূলক বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আন্দোলনে দাঙ্গাকারীদের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সহিংসতা দেখা দেয়।
ইরানি কর্তৃপক্ষ জনগণের বৈধ অর্থনৈতিক ক্ষোভ স্বীকার করে তা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে; তবে বিদেশি হস্তক্ষেপকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাই এসব সংকটের মূল কারণ।
তেহরান থেকে কেশম দ্বীপ পর্যন্ত: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জনতার মিছিল
নেতৃত্বের দৃঢ় বার্তা
ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনি শুক্রবার তার ভাষণে বলেছেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, নৈরাজ্যকারীদের মোকাবিলায় কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না।” তিনি জনগণকে ঐক্য ও শত্রুর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রোববার বলেন, ‘প্রতিবাদ ও দাঙ্গা এক নয়’। তিনি বেসামরিক নাগরিক হত্যার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দাঙ্গাকারীদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিচ্ছে”। স্পিকার কালিবাফও বলেন, “ইরান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকার করে, কিন্তু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকবে।”
জনগণের অঙ্গীকার: শত্রুদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবে
সোমবার র্যালিতে অংশ নেওয়া লাখো মানুষ ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও বিপ্লবের নেতার পাশে থাকার শপথ নেন। তেহরানের অংশগ্রহণকারী মোহাম্মদ আলি আব্বাসি বলেন, “আমরা আমাদের শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না; আমেরিকা ও ইসরায়েলিদের এই নোংরা যুদ্ধ আমরা ব্যর্থ করব।”
ফাতেমা নামের এক নারী অংশগ্রহণকারী বলেন, “অর্থনৈতিক সমস্যা আছে, কিন্তু সমাধান আমাদের মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে। বাইরের শক্তির নির্দেশনা আমরা মেনে নেব না।”
রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রতিজ্ঞা
সাম্প্রতিক সহিংস হামলায় শহীদ হওয়া নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রতিরোধযোদ্ধাদের স্মরণে সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন শহরে চলছে জানাজা ও দাফনের অনুষ্ঠান।
এই লাখো মানুষের মার্চে ইরান আবারও বিশ্বকে জানিয়ে দিল—সন্ত্রাস, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র যতই হোক, জনগণের ঐক্য ভাঙা যাবে না।