রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসচাপ (প্রেসার) না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।কোথাও কোথাও চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকার গ্যাস। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সিএনজিচালিত যানবাহনের চালক ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারকারীরা।

রাজধানীর শ্যামলী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ যানজট ও গাড়ির সারি দেখা গেছে। অনেক চালক অভিযোগ করেছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় নষ্ট হলেও মিলছে না প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস।
সিএনজিচালক মো. সাত্তার মিয়া (৫৫) বাংলানিউজকে বলেন, ৩৫ বছর ধরে ঢাকা শহরে গাড়ি চালাই, কিন্তু শান্তি পেলাম না। একটার পর একটা সমস্যা লেগেই আছে।গত তিন দিন ধরে গ্যাস সংকট চলছে। মালিকের দৈনিক জমা দিতেই হবে, না হলে পরদিন গাড়ি দেবেন না। সকাল থেকে দুইবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। একেকবার সিরিয়ালে তিন থেকে চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মাত্র ৬০-৭০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। নিজের আয় তো দূরের কথা, মালিকের জমা তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সকালে নাশতা করেছি, বিকেল চারটা বাজলেও দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়নি। পাঁচ সদস্যের সংসার চালাব, নাকি বাসাভাড়া দেব? সরকার দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করুক।
রাজধানীর শামলী সরণির এনার্জি প্লাস সিএনজি ফিলিং স্টেশনের চিফ ইঞ্জিনিয়ার মো. আরিফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই গ্যাস সংকট ছিল। তবে গত তিন দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে।

তিনি বলেন, যেখানে গ্যাসের প্রেসার ২০০ থাকার কথা, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯০ থেকে ১০০। ফলে গাড়িগুলো পূর্ণ ট্যাংক গ্যাস নিতে পারছে না। অল্প কিছু দূর চলেই আবার পাম্পে ফিরে আসতে হচ্ছে। একই গাড়ি বারবার লাইনে দাঁড়ানোর কারণে চাপ ও যানজট কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ বা খুবই কম থাকায় চালু থাকা পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। টানা অপারেশনের কারণে কম্প্রেসার মেশিনও বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
চালকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, গ্যাসের প্রেসার নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা পাম্প কর্তৃপক্ষের নেই। তিতাস থেকে যে পরিমাণ গ্যাস আসে, সেই অনুযায়ীই সরবরাহ করা হয়।
সমাধানের বিষয়ে আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনে সরকার যদি গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে চালক ও গ্রাহকদের এই ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
ব্যক্তিগত গাড়িচালক মো. শফিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, তিন থেকে চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পাম্পে পৌঁছানোর পর দেখি প্রেসার মাত্র ৬০ থেকে ৭০। আগে যেখানে ৬০০ থেকে ৬২০ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত, এখন সেখানে ২০০ থেকে ২২০ টাকার বেশি গ্যাস নেওয়া যাচ্ছে না। এই গ্যাসে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার চলা যায়। এরপর আবার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমি গাড়ির মালিক নই, চালক। মালিকের মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সময়মতো যেতে পারিনি। মালিক বলছেন, গ্যাস নিয়েই ফিরতে হবে। আবার পাম্পে বলছে প্রেসার নেই। আমরা দুই দিক থেকেই বিপদে পড়েছি।
তিনি আরও বলেন, যদি পর্যাপ্ত প্রেসারে গ্যাস সরবরাহ সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখুক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সময় ও শ্রম নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।
গ্যাস সংকটের কারণে যেসব সিএনজি স্টেশনে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ চলছে, সেসব স্টেশনের আশপাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে শুধু সিএনজি চালকই নন, সাধারণ যানবাহন চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। চালকরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক (মিডিয়া ও জনসংযোগ) মো. আল আমিন বাংলানিউজকে বলেন, এটি দেশের কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি সমস্যা। মূলত কারিগরি ত্রুটির কারণেই গত দুই-তিন দিন ধরে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মহেশখালী এলাকায় যে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে, তা মেরামতের কাজ শেষ হলেই গ্যাস সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।