২০১৫ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে বিশ্বকাপের দলে যোগ দেন রুবেল হোসেন। খেলেন বিশ্বকাপও।তার ৫৩ রানে ৪ উইকেটের বোলিং ফিগারে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বাংলাদেশ পা রাখে কোয়ার্টার ফাইনালে। অথচ সেই বিশ্বকাপে খেলার কথাই ছিল না রুবেলের।২০২১ সালের পর আর জাতীয় দলে খেলা হয়নি রুবেলের। তবুও তিনি আশায় ছিলেন, হয়তো সুযোগ আসবে।কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন সেটি আর সম্ভব নয়, তখন আর বিষয়টি ঝুলিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নেন এই পেসার। অবসরের ঘোষণার দিন বাংলানিউজের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান তার কিছু আক্ষেপ ও হতাশার কথা।
বাংলানিউজ: কেমন আছেন?
রুবেল হোসেন: এইতো ভাই, আছি।
বাংলানিউজ: হুট করে আজকেই অবসরের সিদ্ধান্ত কেন নিলেন?
রুবেল: এটা হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্ত না। আমি অনেকদিন ধরেই চিন্তা-ভাবনা করছিলাম। আমার ফ্যামিলির সাথেও আলোচনা করেছি। যেহেতু আমি ৫–৬ বছর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের বাইরে আছি, বয়সও হচ্ছে—সব দিক বিবেচনা করেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবসরটা তো নিতে হবেই ভাই। এখন তো আমার আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো সুযোগ নেই। ফলে এখন আর ঝুলিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না, তাই সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।
বাংলানিউজ: সামনে তো সাবেকদের নিয়ে টুর্নামেন্ট আছে, অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটাও কি মাথায় ছিল?
রুবেল: না, না। লিজেন্ড টুর্নামেন্ট মাথায় রেখে না! আমি অনেক বছর ধরেই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটে খেলছি না। গত ২–৩ মাস ধরে বিষয়টা আরও সিরিয়াসলি ভাবছিলাম। ওয়াইফের সাথেও কথা হয়েছে। এখন যেটা ভালো সিদ্ধান্ত মনে হয়েছে, সেটাই নিয়েছি।
বাংলানিউজ: টেস্ট থেকে তো আগেই অবসর নিয়েছেন। কিন্তু ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সর্বশেষ খেলেছেন ২০২১ সালে। আপনি কি সত্যিই ভেবেছিলেন, জাতীয় দলে আরও একবার সুযোগ পাবেন?
রুবেল: হ্যাঁ, ব্যাক অব দ্য মাইন্ডে অবশ্যই ছিল। ডেফিনিটলি ছিল। যেহেতু ওয়ানডে ক্রিকেট আমার খুব পছন্দের ফরম্যাট এবং সেখানেই আমার বেশি সাফল্য। তাই মাঝে মাঝে মনে হতো হয়তো সুযোগ আসতে পারে। কিন্তু বয়সও বাড়ছে, আর এখন যারা খেলছে তারা ভালো করছে—তারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে লিড দেবে। আমি আলহামদুলিল্লাহ যতদিন খেলেছি, বাংলাদেশকে সার্ভিস দিতে পেরেছি—এতে আমি খুশি, কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, এখন আমার রিটায়ারমেন্ট নেওয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।
বাংলানিউজ: আপনি কখন বুঝলেন যে জাতীয় দলে আর ফেরা হবে না?
রুবেল: এটা আমি অনেক আগেই বুঝতে পেরেছি। জাতীয় দলে ফিরতে হলে এখন সুপার পারফরম্যান্স লাগবে, আর বয়স ৩৭ হলে সেটা খুব কঠিন। নিয়মিত খেলাও হয় না। গত মৌসুমে বিপিএল বা প্রিমিয়ার লিগেও সুযোগ হয়নি। আমি ২–৩ বছর আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, আমার আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা হবে না।
বাংলানিউজ: মাঠ থেকে অবসর নিতে পারলেন না, নিশ্চয়ই আক্ষেপে পুড়ছেন?
রুবেল: অবশ্যই। যে কোনো ক্রিকেটারই চাইবে মাঠ থেকে অবসর নিতে। কিন্তু সবার ভাগ্যেতো সব থাকে না। যে হয় নাই, সেটি নিয়ে অবশ্য কষ্ট পেয়ে লাভ নেই।
বাংলানিউজ: ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার কথা বলেছেন—এটা কি আবেগের সিদ্ধান্ত?
রুবেল: না, আবেগ না। ঘরোয়া ক্রিকেটটা হচ্ছে—যদি কেউ আমাকে নেয়, তাহলে আমি খেলব। আমি ডিপিএলে পারফর্ম করেছি সবসময়। যদি সুযোগ পাই, আরও ১–২ বছর খেলতে পারব। না নিলে কিছু করার নেই।
বাংলানিউজ: আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করলেন, কোনো আক্ষেপ কি আছে?
রুবেল: আক্ষেপ তো থাকবেই। আমি ১৫৯–১৬০টার মতো ম্যাচ খেলেছি। যদি ভালোভাবে সুযোগ আরও পেতাম, ২০০–২৫০ ম্যাচ খেলতে পারতাম। কিন্তু এক–দুইটা খারাপ পারফরম্যান্সের পরই অনেক সময় আমাকে বাদ দেওয়া হতো। কিন্তু অন্য অনেক খেলোয়াড় তখনও খেলেছে। আমি আসলে কিছুটা পরিস্থিতির ভেতরে পড়ে গেছি, বলা যায়। তখন কিছু জায়গায় সিদ্ধান্তগুলো অন্যভাবে নেওয়া হতো। এখন এগুলো নিয়ে আর কিছু বলার নেই। যেটা হয়েছে, হয়েছে।
বাংলানিউজ: তবুও একটু বলেন…?
রুবেল: নির্বাচক ও অধিনায়ক—দুপক্ষই আমার সঙ্গে সঠিক বিচার করেনি। আমি মনে করি আমাকে আরও সুযোগ দেওয়া যেত। আমার ভালো সময়টা আমাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল। টিম কম্বিনেশন আর সিনিয়রিটির কারণে অনেক সময় আমি খেলতে পারিনি। সিনিয়রিটির কারণে আমাকে অনেক ম্যাচ থেকে বাইরে থাকতে হয়েছে। এগুলোও আমার আক্ষেপের জায়গা। ডেফিনিটলি এগুলো আক্ষেপই থাকবে।
বাংলানিউজ: ভবিষ্যতে আপনি কী করবেন—ব্যবসা নাকি কোচিং?
রুবেল: ব্যবসা আমার একটা অংশ। তবে ক্রিকেটই আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি কোচিং করতে চাই, মাঠে থাকতে চাই, খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করতে চাই। অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। তবে কোচিং করতে হলে কোচিং কোর্স করতে হবে, আমি সেটা জানি। অনেকেই আমাকে বলেছে কোচিংয়ে আসতে। কোচিং কোর্স নিয়ে সামনেই পরিকল্পনা করব।
বাংলানিউজ: পেসার হান্ট থেকে আজকের রুবেল—যাত্রাটা কেমন ছিল?
রুবেল: পেসার হান্ট আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তখন সুযোগ পেয়েছিলাম বলেই আজ এখানে আসতে পেরেছি। এখন আফসোস লাগে যে পেসার হান্ট আর হয় না। ক্রিকেট বোর্ডের কাছে আমার একটা অনুরোধ থাকবে—আমাদের দেশে নিয়মিত পেসার হান্টটা যেন করে। এখন যেহেতু নতুনভাবে বোর্ডে পরিবর্তন এসেছে, আমি আশা করি তামিম ভাই এই বিষয়টা আবার শুরু করবেন। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে মুস্তাফিজ, তাসকিন, শরিফুল, হাসান মাহমুদ—এদের মতো আরও অনেক ভালো পেসার আমরা পেতে পারি। আমার আজকের রুবেল হয়ে ওঠার পেছনে পেসার হান্টের বড় ভূমিকা ছিল। আর অবশ্যই আমার পুরো পরিবার আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছে।
বাংলানিউজ: দীর্ঘ ক্যারিয়ারের তিনটি স্মরণীয় মুহূর্ত বলবেন?
রুবেল: ২০১৫ বিশ্বকাপের মুহূর্তটা ওয়ানডেতে। টেস্টে শচীন টেন্ডুলকারের উইকেট, চট্টগ্রামে। আর টি–টোয়েন্টিতে ক্রিস গেইলের বিরুদ্ধে একটা স্পেল, সেটা আমার জন্য খুব স্পেশাল।