কানাডার রাজনীতিতে এমন উত্থান খুব বেশি দেখা যায় না। এক বছর আগেও যাকে অনেকেই সাময়িক নেতা হিসেবে দেখছিলেন, সেই মার্ক কার্নি এখন শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, বরং দেশটির রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।তিনটি উপনির্বাচনে তার দল লিবারেল পার্টির বড় জয় সেই অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। বিশেষ করে টরন্টোর দুটি আসনে সহজ জয় এবং মন্ট্রিয়লের উপশহর তেরবোনে নাটকীয় সাফল্য, সব মিলিয়ে কার্নির নেতৃত্বে সরকার এখন আরও শক্তিশালী অবস্থানে।
তেরবোনের জয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এটি সাধারণত বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবাপন্ন, ফরাসিভাষী ভোটারদের এলাকা।সেখানে হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত ২৫ বছর বয়সী প্রার্থী তাতিয়ানা অগাস্ট দ্বিতীয়বারের মতো জয় নিশ্চিত করেন। আগেরবার মাত্র এক ভোটে জয় পেলেও কানাডার সুপ্রিম কোর্ট সেটি বাতিল করেছিল।এবার সেই আসনও লিবারেলদের দখলে থাকায় রাজনৈতিক বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
টরন্টোর দুটি আসনে লিবারেলদের জয় আগে থেকেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু মন্ট্রিয়লের এই ফলাফল দেখিয়েছে, ফরাসিভাষী এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকাতেও কার্নি সমর্থন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যদিও তিনি আলবার্টাভিত্তিক একজন ব্যাংকার এবং ফরাসি ভাষায় তার দুর্বলতা রয়েছে।
কার্নির এই উত্থান অনেকটা অপ্রত্যাশিত মোড় নিয়েই এসেছে। ২০২৫ সালের দিকে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ছিল। জনমত জরিপে বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি ব্যাপক ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি হয়তো অল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী থাকবেন এবং পরে পিয়ের পলিয়েভ্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থানের কারণে। কানাডার ওপর অর্থনৈতিক চাপ এবং দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি ঘিরে দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিকে দক্ষভাবে কাজে লাগান কার্নি।
তিনি নিজেকে সংকট মোকাবিলার উপযুক্ত নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। এমনকি হকি কিংবদন্তি গর্ডি হাওয়ের জনপ্রিয় অভিব্যক্তি ধার করে বলেন, তিনি ‘কনুই উঁচু’ রাখবেন, অর্থাৎ কঠোর অবস্থান নেবেন।
রাজনীতিতে আসার আগে কার্নির পরিচয় ছিল এক অভিজ্ঞ ব্যাংকার হিসেবে। তিনি গোল্ডম্যান স্যাকসে কাজ করেছেন। পরে কানাডা ও যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সময় তিনি হকি খেলোয়াড় হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
এই অভিজ্ঞতা তাকে দ্রুত জনমনে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ফলে বিরোধীদের সঙ্গে ২০ পয়েন্টের ব্যবধানও দ্রুত কমে আসে।
গত নির্বাচনে লিবারেল পার্টি সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেলেও ৩৪৩ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তিন আসন দূরে ছিল। এতে বিরোধীরা সংসদীয় কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি এবং যেকোনো সময় নির্বাচন চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেত।
কার্নি সেই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠেন। বিরোধী দল থেকে পাঁচজন সংসদ সদস্যকে নিজের দলে নিয়ে আসেন। এই রাজনৈতিক কৌশল কিছুটা নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করলেও সমালোচকরা একে গোপন কৌশল হিসেবে দেখেন।
বর্তমানে হাউস অব কমন্সে লিবারেলদের অবস্থান সংখ্যাগরিষ্ঠতার খুব কাছাকাছি, মাত্র তিন আসনের ব্যবধান। ফলে বিরোধীদের চাপিয়ে দেওয়া নির্বাচনের ঝুঁকিও কমে গেছে।
জনমত জরিপেও কার্নির জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বাড়ছে। এমনকি যারা তাকে ভোট দিচ্ছেন না, তারাও ব্যক্তিগতভাবে তাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
জরিপ বিশ্লেষক ফিলিপ জে ফোরনিয়ে বলেছেন, ভোটের প্রবণতার বাইরে গিয়ে কার্নির ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা আলাদা করে চোখে পড়ে। এমনকি আলবার্টা ও প্রেইরি অঞ্চলের মতো লিবারেল বিরোধী এলাকাতেও তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বয়স্ক প্রজন্মের অনেকের কাছে কার্নি এখন এক ধরনের জাতীয় প্রতীক। সংগীতশিল্পী জোনি মিচেল জুনো অ্যাওয়ার্ডসে তাকে ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে তরুণ কানাডিয়ানরা এখনো জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকটে বেশি মনোযোগী। তবে তাদের মধ্যেও ধীরে ধীরে সমর্থন বাড়ছে।
চলতি বছরের শুরুতে ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক বক্তৃতায় কার্নি বৈশ্বিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, আমরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকি, তাহলে আমরা নিজেরাই মেন্যুতে পরিণত হব।
এই বক্তব্য তার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করে।
ক্ষমতায় এসে তিনি ট্রুডোর নীতির অনেক দিক থেকে সরে আসেন। প্রথম বড় সিদ্ধান্ত ছিল কার্বন ট্যাক্স বাতিল। পশ্চিমাঞ্চলের তেলসমৃদ্ধ প্রদেশগুলোর জন্য এটি ছিল বড় বার্তা। একইসঙ্গে আলবার্টার তেল পরিবহনের জন্য নতুন পাইপলাইন প্রকল্পের কথাও তিনি সামনে আনেন।
অভিবাসন নীতিতেও কঠোর অবস্থান নেন কার্নি। পাশাপাশি চীন ও ভারতের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করেন, যা ট্রুডো সরকারের সময় উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
অর্থনীতিতে বড় অবকাঠামো পরিকল্পনা ঘোষণা করেন তিনি। এর মধ্যে কুইবেক সিটি থেকে টরন্টো পর্যন্ত প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক অন্যতম।
প্রতিরক্ষা খাতেও বড় পরিবর্তন আসে। সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশে নেওয়া হয়, যা বার্লিন প্রাচীর পতনের পর এই প্রথম। কানাডায় এখন যুক্তরাষ্ট্র নির্ভরতা কমানোর আলোচনা জোরদার হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে নতুন সাবমেরিন কেনার পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বদলে সুইডিশ যুদ্ধবিমান বিবেচনার কথাও উঠে এসেছে।
কার্নি স্পষ্ট করেছেন, কানাডার অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে হবে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো প্রতিটি ডলারের ৭০ সেন্টের প্রবণতা আর চলবে না।
তিনি আরও বলেন, কানাডার ভেতরে স্থানীয় পণ্য ও পর্যটনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই এখন ক্যালিফোর্নিয়ার বদলে কানাডার অভ্যন্তরীণ গন্তব্য বেছে নিচ্ছেন।
এরই মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সম্মেলনে সরাসরি অংশ নেননি। তবে তিনি ভিডিও বার্তা পাঠান, যেখানে তাকে কেটি পেরির সঙ্গে কোচেলা ভ্যালি মিউজিক অ্যান্ড আর্টস ফেস্টিভ্যালে দেখা যায়।
ট্রুডোর গ্ল্যামার থাকলেও রাজনৈতিক মনোযোগ এখন পুরোপুরি কার্নির দিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লিবারেল পার্টির ঐতিহ্যগত ‘ব্রোকারেজ রাজনীতি’ আবারও ফিরে এসেছে। কার্নি একদিকে বিভিন্ন মতাদর্শকে একত্র করছেন, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে কৌশল সাজাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে, এক সময় যাকে অনিশ্চিত নেতা হিসেবে দেখা হয়েছিল, তিনি এখন কানাডার রাজনৈতিক আস্থার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছেন।