বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত দেড় বছর ছিল এক চরম পরিবর্তনের সময়। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারে বড় ধরণের সংস্কারের আশা করেছিলেন। কিন্তু সূচক ও লেনদেনের গতিপ্রকৃতি সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ফলে বর্তমান বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্ব নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি নতুন নেতৃত্বের গুঞ্জনও ডালপালা মেলেছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ), সোনালী ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদ ছাড়তে হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইতোমধ্যে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিএসইসির নেতৃত্ব পরিবর্তনেরও পদধ্বনি পাওয়া যাচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে চলমান অস্থিরতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকট এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা এখন আলোচিত বিষয়।নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বিএসইসির শীর্ষ পদগুলোতে বসতে ইতিমধ্যে একাধিক ব্যাক্তির নাম আলোচনায় আসছে। এ নিয়ে জোর তদবিরও শুরু হয়েছে। তবে বাজারের উন্নয়নের স্বার্থে দক্ষ এবং সঠিক নেতৃত্ব অপরিহার্য বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আস্থা সংকটে পুঁজিবাজার
বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার পেছনে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদী ও তাৎক্ষণিক কারণ কাজ করছে।
বিগত ১৫ বছরে সুশাসনের অভাব, দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন এবং কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারিয়েছেন। একই সঙ্গে বাজারে সুশাসনের চরম ঘাটিতিও ছিল।
বাজারে ফ্লোর প্রাইস আরোপের মতো কৃত্রিম ব্যবস্থার ফলে বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন ব্যাহত হয়। সম্প্রতি অর্থনীতি নিয়ে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে বিএসইসির নেতৃত্বের দুর্বলতা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে কমিশন নতুন বিধিমালা প্রণয়ন, সংস্কার টাস্কফোর্স ও তদন্ত কমিটি গঠনসহ পুঁজিবাজার সংস্কারে বেশ কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনলেও বাজারের পতন না থামায় স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
তাছাড়া কমিশন বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় করতে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। শুধু তাই নয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাথে সমন্বয়হীনতাও বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করেছে। শুধু তাই নয় গত দেড় বছরে একটি নতুন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগও উল্লেখ্যযোগ্য হারে কমেছে। এতে করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আস্থার সংকট বিরাজ করছে।
বিএসইসির ব্যর্থতা
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত যোগদান করেননি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে বিএসইসির চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার অভাব ছিল এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়নি। মাকসুদ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কার্যকর এবং কার্যকরী করার জন্য বিএসইসির সকল কর্মীদের সহযোগিতা পাননি। অনেক কর্মকর্তার উপর আস্থা রাখতে পারেননি। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কিছু কাজে ভালো দক্ষতা দেখাতে পারেনি।
বিএসইসির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলানিউজকে বলেন, মাকসুদ কমিশনের অধীনে, জরিমানা আরোপ এবং নিয়ম সংস্কারের উপর বেশি জোর দিয়েছিল, যদিও তার মেয়াদে বাজারে একটিও আইপিও অনুমোদন হয়নি।
জানা গেছে, একজন নির্বাহী পরিচালককে বরখাস্ত করার পর বিএসইসির কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন মাকসুদ কমিশন। অতীতের অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে কমিশন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়, কয়েকজনকে জোরপূর্বক অবসর দেয় এবং অন্যদের ওএসডি হিসেবে মনোনীত করে।
সংস্থাটির কর্মীদের অভিযোগ, কমিশনের সকল কর্মীকে এক ছাতার নিচে এনে বিএসইসিকে পুনর্গঠন করার মতো ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার অভাব রয়েছে। অসৎ কর্মকর্তাদের শাস্তি দিতো কিন্তু সৎ দেরও মূল্যায়ন করেননি এটা কমিশনের ব্যর্থতা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিএসইসির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করেছে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতার ফলে বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই অগোছালো থাকে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুঁজি হারানোর ভয়ে বাজার থেকে সরে দাঁড়ান বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে পাঁচটি ইসলামিক ব্যাংককে একীভূত করে এগুলোর শেয়ার মূল্য শূন্য ঘোষণা ঠেকাতে না পারাকে বর্তমান কমিশন সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছের বিনিয়োগকারীরা। এ সিদ্ধান্ত পথে বসিয়ে দেয় হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে। এ ঘটনায় বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন।
নতুন সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় চাওয়া তাদের পুঁজির সুরক্ষা। ২০২৬ সালের শুরুতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুঁজিবাজার নিয়ে আশার আলো দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। অর্থমন্ত্রীর কঠোর বার্তার পরেও বাজারে লেনদেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, বর্তমান কমিশনের কাঠামোর মধ্যে থেকে আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়।
নতুন কমিশন গঠনের দাবি
গত দেড় বছরে বাজারকে স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হওয়ায় নতুন কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে বিনিয়োগকারীরা। তাদের মতে বিএসইসিতে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে পুঁজিবাজারে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। গত ২২ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সরকারের অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে বিনিয়োগকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট ইনভেস্টর অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমআইএ) সভাপতি এস এম ইকবাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম মানিক স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেওয়া হয়।
চিঠিতে বলা হয়, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে পুঁজিবাজার উন্নয়ন গুরুত্ব পাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশা তৈরি হয়েছে। এর প্রতিফলন দেখা যায় নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কর্মদিবসে, যখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং লেনদেন সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। তবে সংগঠনটি বলছে বর্তমান কমিশনের নেতৃত্বে বাজারে প্রত্যাশিত স্থিতিশীলতা ও আস্থা তৈরি হয়নি। তাদের মতে, ২০২৪ সালের পর গঠিত কমিশনের কার্যক্রমে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত হয়নি। পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় যোগ্য, অভিজ্ঞ ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে পুনর্গঠন প্রয়োজন। এতে স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব বাজার গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
নতুন কমিশন সময়ের দাবি
বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য নিয়ন্ত্রক পদে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারই ফলশ্রুতিতে নতুন কমিশন গঠন হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হলে বিএসইসির শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। অভিজ্ঞতার অভাব থেকে উদ্ভূত ত্রুটিগুলি সততা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজার শুধুমাত্র ফটকা বাজারের জায়গা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহের উৎস। গত দেড় বছরের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি দ্রুত বিএসইসি পুনর্গঠন এবং কাঠামোগত সংস্কার না করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় এবং অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।