দেশের যেসব রাষ্ট্রপতি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি

দেশের যেসব রাষ্ট্রপতি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি

মেয়াদ পূরণের প্রায় দুই বছর আগেই গতকাল শুক্রবার (২৪ জুলাই) পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।শুধু ২২তম রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনই নয়, এর আগে আরও কয়েকজন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছিলেন। কেউবা আবার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন কিংবা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন।তাই তারা তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। 

স্বাধীনতার পর থেকে ২২ মেয়াদে এ পর্যন্ত ১৮ জন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। তিনি বঙ্গভবনে দুই মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন।এছাড়া মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ও আবদুর রহমান বিশ্বাস। রাজনৈতিক কারণে মেয়াদের চেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করেছেন ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ।

দেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত এ পদে ছিলেন। তবে তিনি তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম (২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২)।

শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি করা হয় মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহকে। তিনি ছিলেন তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসন ব্যবস্থা (বাকশাল) কায়েম করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহর মেয়াদ শেষ হয়।

রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের পর একই সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে আমৃত্যু তথা ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

তিনি সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তবে ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর এক সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন মোশতাক আহমেদ।

একই দিন শপথ নেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত। তার পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি হন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম। রাষ্ট্রীয় তালিকা অনুযায়ী তিনি দুই পর্বে রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৮ সালে নির্বাচনের পর জয়ী হয়ে ১২ জুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি আমৃত্যু রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে।

একই দিন অস্থায়ী হিসেবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার। ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন তিনি। তবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।

পরে ২৭ মার্চ রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্সানউদ্দিন চৌধুরী। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তাকে অপসারণ করে একই দিন দায়িত্ব নেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

প্রথম পর্বে তিনি ১৯৮৬ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সে বছরের ২৩ অক্টোবর নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নতুন করে শপথ নেন তিনি। গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এরশাদ।

এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। তিনি ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে গিয়েছিলেন।

এরপর বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত পদে থেকে মেয়াদ পূর্ণ করেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাসের পর আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। মেয়াদ পূর্ণ করে পদে ছিলেন ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত।

২০০১ সালে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। তিনি নির্বাচিত হয়ে ২০০২ সালের ২১ জুন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে পদত্যাগ করেন।

তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন স্পিকার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার। নতুন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে ছিলেন। ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শপথ নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিলেন। ২০০৭ সালে তার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ২০০৯ সালে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনি পদে ছিলেন।

এরপর আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন জিল্লুর রহমান। পদে থাকা অবস্থায় ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

এর মধ্যে স্পিকার মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে দুই মেয়াদে অর্থাৎ ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন আবদুল হামিদ।

পরে একই দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে পদত্যাগ করা পর্যন্ত (২০২৬ সালের ২৪ জুলাই) রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2026 EU BANGLA NEWS