যারা সংস্কারকে সংশোধনের নামে ব্যর্থ করে দিতে চান, তাদের এ চক্রান্ত জাতি মেনে নেবে না বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিন।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সুজন আয়োজিত ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জনআকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজন-এর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচারপতি এম এ মতিন। সঞ্চালনা করেন সুজন-এর সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার।
বৈঠকে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য বিদায়ী বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ভূতপূর্ব সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী, ভূতপূর্ব বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. ওয়ারেসুল করীম, নাগরিক কোয়ালিশনের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হাসিব প্রমুখ।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার ব্যাপারে সংবিধানের বিধান থাকলেও ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কোনো সরকার পদক্ষেপ নেয়নি।১৯৯৫ সালে মাজদার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে একটি নির্দেশ জারি করে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল বিভাগে রায়টি চ্যালেঞ্জ করে।সেই মামলায় আপিল বিভাগ ১২টি নির্দেশনা দিয়ে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার মানসে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। ওই রায়ের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচারপতিদের নিয়োগ এবং অন্য একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আলাদা সচিবালয় করার নির্দেশ দেন।
তিনি আরও বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি জয়লাভ করলে তারা সরকার গঠন করে। এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দুটি অধ্যাদেশকে অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট না করায় আইন দুটি বাতিল হয়ে যায়। দীর্ঘ ৭২ বছরে জাতীয় অর্জনকে এভাবে বর্জন করায় গোটা জাতি হতবাক ও মর্মাহত।
বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, আমাদের জাতীয় সংসদ গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের প্রতীক। বিচার বিভাগ দেশে সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। সেই সুরক্ষার প্রয়োজনে এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়নের জন্য বিচারক নিয়োগ এবং সচিবালয় সম্বন্ধীয় অধ্যাদেশ দুটি রচিত হয়েছিল। বর্তমান সংসদ এ আইন দুটিকে সুরক্ষা দেবে, সে আশাতেই বর্তমান ক্ষমতাসীন দলকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী করে জনগণ সংসদে পাঠিয়েছে। তাদের কর্তব্য হচ্ছে এ আইন দুটিকে অ্যাক্ট অব পার্লামেন্ট করা। উক্ত আইনগুলো প্রত্যাশিত সংস্কারের অংশ। এগুলোকে অবশ্য পালনীয় আইন করা সংসদের অবশ্য কতর্ব্য।
তিনি আরও বলেন, মাজদার হোসেন মামলার ১২টি নির্দেশনাবলী এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের সব আদেশাবলী অক্ষরে অক্ষরে পালন করা নির্বাহী বিভাগের অবশ্যই কর্তব্য। আর এগুলো অমান্য করা সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিচার বিভাগের সংস্কার প্রসঙ্গে বিচারপতি এম এ মতিন বলেন, দীর্ঘ এক বছরের সাধনার ফল হচ্ছে গণভোটের মাধ্যমে সমর্থিত সংস্কারসমূহ। এগুলোর বাস্তবায়নে সব দল অঙ্গীকারাবদ্ধ। ওই সংস্কার এখন আমাদের অলিখিত সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত। অলিখিত সংবিধানে আমাদের ইতিহাস এবং সব প্রিসিডেন্টস অন্তর্ভুক্ত। এখন যারা সংস্কারকে সংশোধনের নামে ব্যর্থ করে দিতে চান, তাদের এ চক্রান্ত জাতি মেনে নেবে না। সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য অনুচ্ছেদ ১৪২ যথেষ্ট নয় বলেই গণভোট হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তারেক রহমানের সরকার প্রথমেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অমান্য করেছে। দুটো শপথের জায়গায় ক্ষমতাসীন জোটের এমপিরা শুধু একটি শপথ নিয়েছেন। সংস্কার সম্বন্ধে তারা সংবিধানের দোহাই দিয়ে মূলত সংস্কারকে অস্বীকার করেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু এবং ১৩টি সংশোধিত আকারে পাস হয়েছে। এর মধ্যে ৭টি অধ্যাদেশ বাতিল-সংক্রান্ত বিল হিসেবে পেশ করা হয় এবং ১৬টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন না করায় বাতিল বলে গণ্য হয়েছে। এমনকি দীর্ঘ ৭২ বছরে বিরামহীন সংগ্রাম এবং সাধনার ফল সুপ্রিম কোর্টের জজদের নিয়োগ এবং অত্র আদালতের জন্য আলাদা সচিবালয় সম্বন্ধীয় দুটি অধ্যাদেশও বাতিল করা হয়। অথচ গণভোটের পর এসব অধ্যাদেশ পালন করা ছিল জাতীয় কর্তব্য।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সাংবিধানিক হলো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। আর বিচার বিভাগ হলো সংবিধানের অভিভাবক। বিচার বিভাগের সততা বজায় রাখার জন্য এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা দরকার। একইসঙ্গে দরকার বিচার বিভাগের প্রতি জনআস্থা গড়ে তোলা। আমাদের এমন বিচার বিভাগ গড়ে তোলা দরকার, যাতে একজন রিকশাচালক থেকে সমাজের সব স্তরের মানুষ বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা রাখতে পারে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দীর্ঘ ২৬ বছর পরও কোনো সরকারই মাজদার হোসেন মামলা বাস্তবায়ন করেনি। অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগ নিয়ে দুটো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার সেগুলো বাতিল করেছে। সরকার বলেছে, এ বিষয়ে তারা আরও ভালো আইন করবে। কিন্তু সরকার আশ্বাস দিলেও তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে আমরা নাগরিকরা আশস্ত হতে পারছি না। নাগরিকরা সোচ্চার হলে সরকার তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও সংস্কার করতে বাধ্য হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার বলছে, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে তাদের উচিত হবে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা।
ব্যারিস্টার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রদত্ত একটি যুগান্তকারী রায়ে হাইকোর্ট সরকারকে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আপিল করা হয়নি। আপিল দায়ের না করে এবং স্থগিতাদেশ না নিয়ে সরকারের পক্ষে এই রায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। এই পরিস্থিতিতে সচিবালয় বিলুপ্ত করার এবং এর তহবিল আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তটি আদালত অবমাননার শামিল, যা দণ্ডনীয় অপরাধ।
তিনি আরও বলেন, সরকারের যে অবস্থান তা হলো, যেহেতু হাইকোর্ট বিভাগ আপিল দায়ের করার জন্য সার্টিফিকেট দিয়েছে, তাই এর রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত হয়ে গেছে। এই অবস্থান সুস্পষ্টভাবে ভ্রান্ত। কেননা আইনের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি যে, শুধু আপিল দায়ের করলেই হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত হয় না।
ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এর আগে সরকার কোনো কাঠামোগত প্রক্রিয়া ছাড়াই ২৩ জনকে আগের আইনে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। তখন এ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। তখন সরকারের অনুধাবন হলো এ বিষয়ে দ্রুত একটা আইন করা দরকার। অনেক আলাপ-আলোচনা করেই এই অধ্যাদেশটি প্রণীত হয়েছিল, যাতে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দেওয়া। সরকার এখন বলছে তারা আরও ভালো আইন করবে। কিন্তু সরকারের উচিত ছিল অধ্যাদেশটি কেন বাতিল করা হলো তার ব্যাখ্যা দেওয়া।
তিনি আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। এতে অনেক পজিটিভ ইনোভেশন ছিল। কিন্তু সরকারের লোকজন মনে হয় আইনটা ভালো করে পড়েনি। তারা জনগণকে বোকাসোকা ভাবছে, যা দুঃখজনক।
ফাহিম মাশরুর বলেন, ৭০ শতাংশ মানুষ যে গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা তেমন কোনো চাপ দেখছি না। গণভোটের পক্ষে যেহেতু জনগণের রায় এসেছে, তাই জুলাই সনদের উপরেই এর স্থান পাওয়ার কথা।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জুলাই সনদে কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগকে যুক্ত না করার ব্যাপারেও রাজনৈতিক ঐকমত্য আছে। কিন্তু বিচার বিভাগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল ও সংস্কার বাস্তবায়ন না করে বর্তমান সরকার আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগকে যুক্ত করার পথে হাঁটছে।